সঙ্গতিবিধান।সঙ্গতি বিধানের কৌশল বা প্রতিরক্ষণ কৌশল বলতে কী বোঝায়? যেকোনো তিনটি সংগতিবিধানের কৌশল উদাহরণসহ আলোচনা করো।
সঙ্গতিবিধান।সঙ্গতি বিধানের কৌশল বা প্রতিরক্ষণ কৌশল বলতে কী বোঝায়? যেকোনো তিনটি সংগতিবিধানের কৌশল উদাহরণসহ আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।
• সংগতি বিধানের কৌশল বা প্রতিরক্ষণ কৌশল (Defense Mechanisms)
মানুষ যখন তার চারপাশের পরিবেশ, সমাজ বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, তখন তার মনের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, হতাশা এবং দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এই অতিরিক্ত মানসিক অশান্তি থেকে নিজের অহং বা ব্যক্তিত্বকে (Ego) রক্ষা করার জন্য এবং মনের অবচেতন স্তরে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য মানুষ যে সমস্ত কৌশল বা মনস্তাত্ত্বিক উপায়ের আশ্রয় নেয়, সেগুলিকে সংগতি বিধানের কৌশল বা প্রতিরক্ষণ কৌশল (Defense Mechanisms)বলা হয়।
মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Fre
এবং পরবর্তীতে তার কন্যা আনা ফ্রয়েড (Anna Freud)** এই ধারণাটি বিশদভাবে ব্যক্ত করেন। এই কৌশলগুলি মানুষ মূলত অবচেতনভাবে (Unconsciously) ব্যবহার করে থাকে যাতে সাময়িক দুঃখ বা গ্লানি থেকে নিজেকে আড়াল করা যায়।
## তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংগতি বিধানের কৌশল (উদাহরণসহ)
শিক্ষার্থীদের মানসিক আচরণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এমন তিনটি প্রধান কৌশল নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
### ১. যৌক্তিকতা প্রতিপাদন (Rationalization)
যখন কোনো ব্যক্তি কোনো কাজে ব্যর্থ হয় বা সমাজবিরোধী কোনো আচরণ করে, তখন সে তার ব্যর্থতার আসল ও প্রকৃত কারণটি স্বীকার না করে একটি মনগড়া, আপাত-যুক্তিযুক্ত এবং সমাজগ্রাহ্য কারণ দেখিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে। একেই যৌক্তিকতা প্রতিপাদন (বা সাধারণ কথায় অজুহাত দেখানো) বলা হয়। এটি মূলত দু-রকমের হয়—'আঙুর ফল টক' এবং 'লেবু মিষ্টি' মনোভাব।
* **উদাহরণ ১:** পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পেয়ে কোনো ছাত্র যদি বলে, "আসলে পরীক্ষার আগের দিন রাতে আমাদের এলাকায় লোডশেডিং ছিল, তাই রিভিশন দিতে পারিনি; নয়তো আমিই ফার্স্ট হতাম।"
* **উদাহরণ ২:** উচ্চপদস্থ কোনো ইন্টারভিউতে রিজেক্ট হওয়ার পর কোনো চাকরিপ্রার্থী যদি নিজেকে সান্ত্বনা দিতে বলেন, "ওই কোম্পানির পরিবেশটাই ভালো না, ওখানে কাজ না পাওয়াই মঙ্গল হয়েছে।"
### ২. প্রক্ষেপণ (Projection)
নিজের ভেতরের কোনো অনৈতিক ইচ্ছা, দোষ, দুর্বলতা বা খামতির দায় নিজের ঘাড়ে না নিয়ে, যখন কোনো ব্যক্তি তা অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন তাকে প্রক্ষেপণ বলে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিক গ্লানি থেকে বাঁচতে অন্যকে বলির পাঁঠা বানায়।
* **উদাহরণ ১:** পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করার সময় ধরা পড়ে যাওয়ার পর কোনো শিক্ষার্থী যদি শিক্ষককে বলে, "ক্লাসের সবাই দেখাদেখি করছিল, আপনি শুধু আমাকেই ধরলেন।" অর্থাৎ সে নিজের অপরাধকে অন্যের ওপর চাপিয়ে লঘু করার চেষ্টা করছে।
* **উদাহরণ ২:** খেলায় হেরে যাওয়ার পর একজন ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় যদি দাবি করে যে তার র্যাকেটটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল বা কোর্টের নেটটি সঠিক উচ্চতায় ছিল না (বাঙালি প্রবাদের ভাষায়: *নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা*)।
### ৩. স্থানচ্যুতি (Displacement)
যখন কোনো ব্যক্তি তার মনের তীব্র ক্ষোভ, রাগ বা নেতিবাচক আবেগ মূল উৎসের ওপর প্রকাশ করতে পারে না (সাধারণত শাস্তির ভয়ে বা মূল উৎসটি বেশি শক্তিশালী হওয়ায়), তখন সে তার সেই আবেগকে তুলনামূলক কম শক্তিশালী, নিরাপদ এবং দুর্বল কোনো বিকল্প ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর স্থানান্তরিত করে উগড়ে দেয়।
* **উদাহরণ ১:** বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে বকুনি খাওয়ার পর একজন সহ-শিক্ষক সরাসরি প্রধান শিক্ষকের ওপর রাগ দেখাতে পারেন না। তিনি ক্লাসরুমে এসে কোনো নিরীহ শিক্ষার্থীর সামান্য ভুলে তার ওপর প্রচণ্ড চিৎকার করলেন এবং শাস্তি দিলেন।
* **উদাহরণ ২:** কোনো ছাত্র পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার কারণে নিজের পড়ার টেবিলের ওপর রাগ দেখিয়ে খাতা-পত্র ছুঁড়ে ফেলে দিল কিংবা তার প্রিয় খেলনাটি আছাড় মেরে ভেঙে ফেলল।
## শিক্ষাগত তাৎপর্য (Educational Value)
শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এই প্রতিরক্ষণ কৌশলগুলি জানা শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত জরুরী। শিক্ষার্থীরা যখন ক্লাসে পড়া না পারলে অজুহাত দেয় (যৌক্তিকতা প্রতিপাদন) বা বন্ধুদের দোষ দেয় (প্রক্ষেপণ), তখন শিক্ষকের উচিত তাদের কঠোর শাস্তি না দিয়ে সহানুভূতির সাথে তাদের ভেতরের মানসিক দ্বন্দ্ব বা ভয়টি বোঝার চেষ্টা করা এবং সঠিক গাইডেন্স দেওয়া।
Comments
Post a Comment