Skip to main content

ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো আলোচনা কর। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।



পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) চতুর্থ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনার (History Minor) পরীক্ষার জন্য ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বড় প্রশ্ন (১০ বা ১২ নম্বরের)। এই প্রশ্নের উত্তরটি পয়েন্ট আকারে এবং স্পষ্ট তথ্যের সাথে লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যায়।

নিচে পরীক্ষার উপযোগী করে একটি আদর্শ উত্তর দেওয়া হলো:

## ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের ঘুণে ধরা সামাজিক বৈষম্য এবং দেউলিয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এটি ছিল ফরাসি জনগণের এক পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

## ক) সামাজিক কারণ: 'প্রাচীন ব্যবস্থা' (Ancien Régime) ও শ্রেণীর সংঘাত

বিপ্লবের প্রাক্কালে ফরাসি সমাজ আইনগতভাবে তিনটি স্তরে বা 'এস্টেট'-এ (Estates) বিভক্ত ছিল। এই ব্যবস্থার চরম বৈষম্যই বিপ্লবের মূল কারণ ছিল।

 * **প্রথম এস্টেট (যাজক সম্প্রদায়):** ফরাসি সমাজের এই শীর্ষ স্তরে ছিলেন যাজকরা (Clergy)। দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৫% হয়েও তাঁরা ফ্রান্সের প্রায় ১০% জমির মালিক ছিলেন। তাঁরা কোনো কর দিতেন না, উল্টো সাধারণ মানুষের ওপর 'তিত' (Tithe) নামক ধর্মীয় কর চাপিয়ে দিতেন।

 * **দ্বিতীয় এস্টেট (অভিজাত সম্প্রদায়):** এই স্তরে ছিলেন অভিজাতরা (Nobles), যাঁরা জনসংখ্যার মাত্র ১.৫% ছিলেন। দেশের মোট জমির ২০ থেকে ২৫% তাঁদের দখলে ছিল। রাষ্ট্রের সমস্ত উচ্চপদ, বিচারালয় এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব তাঁদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তাঁরাও কর প্রদান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন।

 * **তৃতীয় এস্টেট (সাধারণ মানুষ):** দেশের বাকি **৯৮% মানুষ** ছিলেন এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে ছিলেন ধনী বুর্জোয়া (ডাক্তার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী), কৃষক, শ্রমিক এবং দিনমজুর। সমাজের সমস্ত উৎপাদনশীল কাজ এরাই করতেন এবং রাষ্ট্রের **৯৭% করের বোঝা** এদেরই বইতে হতো। অথচ রাজনীতি বা প্রশাসনে এদের কোনো অধিকার ছিল না।

> **সামাজিক ক্ষোভের রূপ:** ঐতিহাসিক লাব্রুস-এর মতে, বুর্জোয়ারা ছিল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ কিন্তু সামাজিকভাবে মর্যাদাহীন। অন্যদিকে কৃষকরা ছিল করের বোঝা এবং সামন্ততান্ত্রিক শোষণে জর্জরিত। এই দুই শ্রেণীর মেলবন্ধনই ফরাসি বিপ্লবের জন্ম দেয়।

## খ) অর্থনৈতিক কারণ: "একটি দেউলিয়া রাষ্ট্র"

বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে ঐতিহাসিক অ্যাডাম স্মিথ ফ্রান্সকে **"ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর"** বলে অভিহিত করেছিলেন।

 * **বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা:** ফ্রান্সের কর ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অন্যায়মূলক। ধনীরা কর দেওয়া থেকে ছাড় পেত, আর দরিদ্রদের ওপর জোরপূর্বক কর চাপানো হতো। কৃষকদের আয়ের প্রায় ৭০-৮০% বিভিন্ন কর যেমন— **টেইলি** (ভূমিকর), **ক্যাপিটেশন** (মাথাপিছু কর), **গ্যাবেল** (লবণ কর) এবং **コルヴェ / কর্ভি** (বিনা মজুরিতে বাধ্যতামূলক শ্রম) দিতেই চলে যেত।

 * **রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা এবং যুদ্ধঋণ:** রাজা চতুর্দশ ও পঞ্চদশ লুইয়ের আমল থেকেই ফরাসি রাজকোষ শূন্য হতে শুরু করে। ষোড়শ লুইয়ের আমলে ভার্সাই প্রাসাদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ফ্রান্সের অংশগ্রহণের ফলে দেশ এক বিশাল ঋণের সাগরে ডুবে যায়। ১৭৮৯ সালে ফরাসি সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ বিলিয়ন লিভর।

 * **ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যসংকট:** ১৭৮৮ ও ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে তীব্র শীত ও শিলাবৃষ্টির কারণে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে ফ্রান্সে রুটির দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যায়। ক্ষুধার্থ মানুষ বাঁচার তাগিদে হিংসাত্মক হয়ে ওঠে, যা 'রুটি দাঙ্গা' (Bread Riots) নামে পরিচিত।

 * **অর্থনৈতিক সংস্কারের ব্যর্থতা:** পরিস্থিতি সামাল দিতে ষোড়শ লুই তুর্গো, নেকার এবং ক্যালোনের মতো অর্থামন্ত্রীদের নিয়োগ করেছিলেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন যে সংকট কাটাতে অভিজাত ও যাজকদের ওপর কর বসাতে হবে। কিন্তু স্বার্থান্বেষী অভিজাতদের বিরোধিতার কারণে রাজা তাঁদের বরখাস্ত করতে বাধ্য হন। ফলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

## মূল্যায়ন

উপসংহারে বলা যায়, ফরাসি সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণী বৈষম্য এবং ফরাসি রাজকোষের দেউলিয়া অবস্থা পরস্পর মিলে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। করের বোঝায় পিষ্ট তৃতীয় এস্টেট যখন ক্ষুধার মুখে রুটি পাচ্ছিল না, তখনই তাঁরা বোঝে যে প্রচলিত ব্যবস্থা ভাঙা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটই অবশেষে ১৭৮৯ সালের ৫ মে 'এস্টেটস জেনারেল'-এর অধিবেশন ডাকতে রাজাকে বাধ্য করে এবং ফরাসি বিপ্লবের সূচনা ঘটায়।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...