Skip to main content

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের আভ্যন্তরীণ সংস্কার গুলি বর্ণনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।




পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর (History Minor) সিলেবাসের "আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস" (Napoleonic Era and Aftermath) অধ্যায় অনুযায়ী নেপোলিয়ন বোনাপার্টের আভ্যন্তরীণ সংস্কার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন। পরীক্ষায় ১০ বা ১২ নম্বরের উত্তর হিসেবে লেখার জন্য নিচে একটি সহজ ও তথ্যসমৃদ্ধ কাঠামো দেওয়া হলো:

## নেপোলিয়ন বোনাপার্টের আভ্যন্তরীণ সংস্কারসমূহ

ফরাসি বিপ্লবের পর ফ্রান্সের বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কনসুলেট শাসনের মাধ্যমে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা লাভ করে তিনি ফ্রান্সে শান্তি ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাপক সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এই সংস্কারগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল বিপ্লবের মূল আদর্শগুলোকে প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী রূপ দেওয়া।

### ১. প্রশাসনিক সংস্কার (কেন্দ্রীয়করণ)

নেপোলিয়ন ফ্রান্সে এক শক্তিশালী ও দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

 * তিনি ফরাসি বিপ্লবের সময় গড়ে ওঠা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে চরম কেন্দ্রীয়করণ নীতি গ্রহণ করেন।

 * ফ্রান্সকে কয়েকটি **'ডিপার্টমেন্ট'** (Department) বা প্রদেশে বিভক্ত করে তার শাসনের দায়িত্ব নিজের অনুগত লর্ড প্রিফেক্ট এবং সাব-প্রিফেক্টদের হাতে তুলে দেন।

 * এর ফলে দুর্নীতি বন্ধ হয় এবং সরকারি কাজে গতি আসে।

### ২. আইন সংস্কার: 'কোড নেপোলিয়ন' (Code Napoleon)

নেপোলিয়নের সবচেয়ে স্থায়ী ও গৌরবময় কীর্তি হলো তাঁর আইন সংহতি বা **'কোড নেপোলিয়ন'**। বিপ্লবের আগে ফ্রান্সে কোনো সুনির্দিষ্ট এবং একরূপ আইন ছিল না। নেপোলিয়ন ৪ জন প্রখ্যাত আইনজীবীর সহায়তায় ২২৮১টি ধারা সম্বলিত একটি আইন বুক তৈরি করেন।

 * **মূল নীতি:** এই আইনে আইনের চোখে সবার সমতা, যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সামন্ততান্ত্রিক কর ব্যবস্থার চিরতরে বিলোপ ঘটানো হয়।

 * **সীমাবদ্ধতা:** তবে এই আইনে নারীদের অধিকার খর্ব করা হয়েছিল এবং শ্রমিকদের তুলনায় মালিকপক্ষের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

### ৩. অর্থনৈতিক সংস্কার

বিপ্লবের ধাক্কায় ফ্রান্সের দেউলিয়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নেপোলিয়ন একাধিক দূরদর্শী পদক্ষেপ নেন:

 * **ব্যাংক অফ ফ্রান্স প্রতিষ্ঠা:** অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব আনার জন্য ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি 'ব্যাংক অফ ফ্রান্স' (Bank of France) প্রতিষ্ঠা করেন।

 * **নতুন মুদ্রা:** লুণ্ঠিত বা জাল মুদ্রা বন্ধ করে তিনি সোনা ও রূপার নতুন মুদ্রা (Franc) চালু করেন।

 * **কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ:** কর আদায়ের পদ্ধতিকে সুনির্দিষ্ট করে সরকারি কর্মচারীদের মাধ্যমে সরাসরি কর আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়, যার ফলে রাজকোষ দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

### ৪. ধর্মীয় সংস্কার: 'কনকর্ডাট' বা ধর্মীয় চুক্তি (Concordat of 1801)

ফরাসি বিপ্লবের সময় রোমান ক্যাথলিক চার্চের সাথে ফ্রান্স সরকারের যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, নেপোলিয়ন তা মিটিয়ে ফেলেন। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি পোপ সপ্তম পিউসের সাথে **'কনকর্ডাট'** বা ধর্মীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

 * এই চুক্তি অনুযায়ী ক্যাথলিক ধর্মকে ফ্রান্সের অধিকাংশ মানুষের ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

 * তবে যাজকদের নিয়োগ এবং বেতন দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতেই থাকে এবং পোপ বিপ্লবী সরকারের বাজেয়াপ্ত করা চার্চের সম্পত্তি আর ফেরত পাবেন না বলে মেনে নেন। এর ফলে ফ্রান্সে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় গৃহবিবাদের অবসান ঘটে।

### ৫. শিক্ষা সংস্কার

নেপোলিয়ন ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

 * তিনি প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষার স্তরগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনেন।

 * উচ্চ শিক্ষার জন্য ফ্রান্সে বেশ কিছু মাধ্যমিক স্কুল বা **'লাইসি'** (Lycee) এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য 'নরমাল স্কুল' প্রতিষ্ঠা করা হয়।

 * ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি **'ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রান্স'** প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন বোর্ডের অধীনে নিয়ে আসেন।

### ৬. জনকল্যাণমূলক ও অন্যান্য কাজ

বেকারত্ব দূর করতে নেপোলিয়ন প্রচুর রাস্তাঘাট, সেতু, খাল এবং বন্দর নির্মাণ করেন। তিনি প্যারিস শহরকে সুন্দর মনুমেন্ট ও স্মৃতিসৌধ দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। বিজ্ঞান ও শিল্পকলার প্রসারেও তিনি বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। যোগ্যতা ও বীরত্বের সম্মান জানাতে তিনি **'লিজিয়ন অফ অনার'** (Legion of Honour) নামক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা চালু করেন।

## মূল্যায়ন

নেপোলিয়নের সংস্কারগুলোর মূল উদ্দেশ্য রাজতন্ত্রের মতো একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হলেও, তিনি ফরাসি বিপ্লবের প্রধান সামাজিক অর্জনগুলোকে আইনি রূপ দিয়েছিলেন। এই কারণেই ঐতিহাসিক ফিশার বলেছেন, *"নেপোলিয়ন যদি বিপ্লবের সংহারকর্তা হন, তবে তিনিই ছিলেন তার উত্তরাধিকারী।"* স্বয়ং নেপোলিয়ন তাঁর সেন্ট হেলেনা দ্বীপের নির্বাসিত জীবনে আক্ষেপ করে বলেছিলেন— *"আমার ৪০টি যুদ্ধের জয় গৌরব আমার 'কোড নেপোলিয়ন' বা আইন সংহতির চেয়ে বড় নয়, এটিই চিরকাল টিকে থাকবে।"*

নেপোলিয়নের শাসনকাল ও ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী ইউরোপের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি ভালো করে বুঝতে এই WBSU Sem 6 History Suggestion Video দেখতে পারেন, যা আপনাকে আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সাহায্য করবে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...