Skip to main content

ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকা আলোচনা কর পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সিলেবাস অনুসারে


পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) চতুর্থ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনার (History Minor) সিলেবাসের কাঠামো অনুযায়ী ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য উত্তরটিকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে সাজিয়ে লেখা প্রয়োজন।

নিচে পরীক্ষার উপযোগী করে একটি সহজ ও গোছানো উত্তর প্রস্তুত করে দেওয়া হলো:

## ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকা

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না। এই বিপ্লবের পেছনে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি একটি বড় বৌদ্ধিক প্রস্তুতি ছিল। ভলতেয়ার, রুসো, মন্তেস্কু এবং ডেনিস দিদেরোর মতো ফরাসি দার্শনিকরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে ফরাসি জনগণের মন থেকে অন্ধবিশ্বাস দূর করে বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন।

### ১. মন্তেস্কু এবং স্বৈরাচারের বিরোধিতা

মন্তেস্কু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ **'দ্য স্পিরিট অফ লজ'** (The Spirit of the Laws)-এ ফরাসি রাজতন্ত্রের 'দৈবস্বত্ব' তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির (Separation of Powers) পক্ষে সওয়াল করেন, যেখানে শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ একে অপরের থেকে স্বাধীন থাকবে। তাঁর এই মতবাদ ফরাসি বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে রাজার চরম স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

### ২. ভলতেয়ার এবং চার্চের দুর্নীতির প্রকাশ

ভলতেয়ার ছিলেন যুক্তিবাদের প্রতীক। তিনি তাঁর **'কাদিদ'** (Candide) ও **'ফিলজফিক্যাল ডিকশনারি'** গ্রন্থে ক্যাথলিক চার্চের দুর্নীতি, কুসংস্কার এবং যাজকদের ভণ্ডামির ওপর তীব্র আঘাত হানেন। তিনি চার্চকে একটি "অভিশপ্ত প্রতিষ্ঠান" (L'infâme) বলে অভিহিত করেন। তাঁর ব্যঙ্গাত্মক লেখনী ফরাসি জনগণের মন থেকে চার্চ ও রাজতন্ত্রের প্রতি অন্ধ ভক্তি ও ভয় দূর করে দিয়েছিল।

### ৩. রুসো এবং ফরাসি বিপ্লবের মূল মন্ত্র

জঁ জাক রুসোকে ফরাসি বিপ্লবের "প্রধান উদ্গাতা" বা জনক বলা হয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ **'সামাজিক চুক্তি'** (The Social Contract)-র প্রথম বাক্যটিই ছিল— *"মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত।"*

 * **জনগণই সার্বভৌম:** রুসো প্রচার করেন যে রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার উৎস রাজা নন, বরং সাধারণ জনগণ ('General Will' বা সাধারণ ইচ্ছা)।

 * **সাম্য ও স্বাধীনতা:** তাঁর এই তত্ত্বই পরবর্তীকালে ফরাসি বিপ্লবের মূল আদর্শ— **সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা** (Liberty, Equality, Fraternity) গঠনে সাহায্য করেছিল।

### ৪. এনসাইক্লোপედিস্ট বা বিশ্বকোষ রচয়িতাগণ

ডেনিস দিদেরো এবং ডি'অ্যালমবার্টের নেতৃত্বে একদল পণ্ডিত **'বিশ্বকোষ'** (Encyclopédie) সংকলন করেন। এই গ্রন্থে বিজ্ঞানের অগ্রগতি, সামাজিক বৈষম্য এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। এটি পড়ার পর ফরাসি বুদ্ধিজীবী সমাজ বুঝতে পারে যে প্রচলিত ব্যবস্থা কতটা পচে গেছে।

### ৫. ফিজিওক্র্যাটস বা অর্থনীতিবিদগণ

কুয়েসনে (Quesnay) এবং তুর্গোর (Turgot) মতো ফিজিওক্র্যাটস বা ফরাসি অর্থনীতিবিদরা তৎকালীন বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁরা বাণিজ্যের ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার দাবি জানান, যা ফরাসি বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীকে (তৃতীয় সম্প্রদায়) আলোড়িত করেছিল।

> **ঐতিহাসিক বিতর্ক (মূল্যায়ন):**

> দার্শনিকরা নিজেরা সরাসরি কোনো বিপ্লব বা রক্তপাত চাননি। তাঁরা ছিলেন সংস্কারপন্থী। কিন্তু তাঁদের লেখা তৎকালীন ফ্রান্সের প্রচলিত শাসনব্যবস্থার (Ancien Régime) ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। লুই ব্লাঁ-র মতো ঐতিহাসিকদের মতে, দার্শনিকরাই ফরাসিদের মনে বিপ্লবের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। আবার নেপোলিয়ন বোনাপার্ট স্বয়ং বলেছিলেন— *"রুসো না থাকলে ফরাসি বিপ্লব হতো না।"*

তাই বলা যায়, দার্শনিকরা সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই না করলেও, ফরাসি জনগণের মগজে যে বৈপ্লবিক চিন্তার আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা ছাড়া ১৭৮৯-এর গণবিস্ফোরণ অসম্ভব ছিল।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...