Skip to main content

চন্দ্রগুপ্ত নাটকের নামকরণের সার্থকতা: "নাটকটির নাম 'চন্দ্রগুপ্ত' রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে তা আলোচনা করো।

চন্দ্রগুপ্ত নাটকের নামকরণের সার্থকতা: "নাটকটির নাম 'চন্দ্রগুপ্ত' রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে তা আলোচনা করো।"পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর। 

          আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সাহিত্যে বা নাটকে ‘নামকরণ’ কেবল একটি পরিচয় চিহ্ন মাত্র নয়; তা হলো রচনার অন্তর্নিহিত ভাববস্তু, চরিত্র বা মূল সমস্যার একটি শৈল্পিক ইঙ্গিত। আর সেখানে নামকরণ সাধারণত তিনটি প্রধান ভিত্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে।সেই ভিত্তিগুলি হলো যথাক্রমে- চরিত্রপ্রধান, ঘটনাপ্রধান অথবা ভাবব্যঞ্জনামূলক। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ (১৯১১) একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক। নাটকটির নামকরণ প্রধান চরিত্র ‘চন্দ্রগুপ্ত’-এর নামানুসারে করা হয়েছে।এখন প্রশ্ন হলো, সামগ্রিক নাট্যভাবনার বিচারে এই নামকরণ কতটা সার্থকতা লাভ করেছে। আর সেটিই আমরা নিম্নে আলোচনা করবো-

       •ঐতিহাসিক পটভূমি ও নাটকের বৃত্তের আঙ্গিকে নাটকের পটভূমি গ্রিক বিজেতা সেকান্দার শাহ বা আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ এবং পরবর্তীকালে মগধের সিংহাসন থেকে অত্যাচারী নন্দরাজাকে উৎখাত করার ঘটনা। এই বিশাল ঐতিহাসিক ক্যানভাসে নাট্যকার মূলত দুটি ধারাকে সমান্তরালে এগিয়ে নিয়ে গেছেন-

   •একদিকে গ্রিক ও ভারতীয়দের সংঘর্ষ এবং মেসিডোনিয়ার সম্রাট আলেকজান্ডারের মহত্ব।অন্যদিকে মগধের হৃত গৌরব উদ্ধার এবং ভারতের সিংহাসনে আরোহণের জন্য তরুণ মৌর্য যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তের কঠিন সংগ্রাম।

      •কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে চন্দ্রগুপ্তের গুরুত্ব দিক থেকে নামকরণের প্রধান যুক্তি হলো-চন্দ্রগুপ্তই এই নাটকের আখ্যানভাগের মূল চালিকাশক্তি। নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।আর সেখানে-

     • প্রথম জীবনে সে সিংহাসনচ্যুত, নির্বাসিত এবং মগধের রাজপুত্র হয়েও ভাগ্যান্বেষণে গ্রিক শিবিরে সামরিক শিক্ষা নিতে বাধ্য হয়েছে।আবার মধ্যপর্বে সে আচার্য চাণক্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে মগধের উদ্ধার সাধনে ব্রতী হয়েছে। চাণক্যের কূটনীতি যতই প্রবল হোক না কেন, সেই নীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য ও প্রয়োগক্ষেত্র কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত স্বয়ং।তবে-

       নাটকের অন্তিমে গ্রিকদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন, সেলুকাস-কন্যা হেলেনের সঙ্গে বিবাহ এবং চাণক্যের আশীর্বাদে মগধের সম্রাট হিসেবে চন্দ্রগুপ্তের অভিষেক ঘটেছে। অর্থাৎ, নাটকের পরিণতি চন্দ্রগুপ্তেরই জয়যাত্রা।

     •দ্বান্দ্বিক চরিত্র ও মানবিক রূপায়নের দিক থেকে দ্বিজেন্দ্রলাল চন্দ্রগুপ্তকে কেবল একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে দেখাননি, তাকে দেখিয়েছেন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে। তার মধ্যে একদিকে আছে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শৌর্য, অন্যদিকে আছে ছায়াদেবী ও হেলেনের প্রতি মানবিক কোমলতা। আলেকজান্ডার যখন চন্দ্রগুপ্তকে বন্দি করেন, তখন চন্দ্রগুপ্তের নির্ভীক উক্তি "ভারতবর্ষ ভীরু নয়"- প্রমাণ করে যে সে সমগ্র ভারতের আত্মমর্যাদার প্রতীক। আলেকজান্ডার নিজেও তার এই বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাকে মুক্ত করেছিলেন।আর সেখানে-

  • চাণক্য বনাম চন্দ্রগুপ্ত চরিত্রের বিতর্ক অনেকে মনে করেন, নাটকটিতে কূটনীতিবিদ ‘চাণক্য’ চরিত্রটি এতটাই উজ্জ্বল এবং শক্তিশালী যে নাটকটির নাম ‘চাণক্য’ হলেই বোধহয় বেশি ভালো হতো। কারণ চাণক্যের ইচ্ছা ও চালনাতেই সমস্ত ঘটনা ঘটেছে।কিন্তু-

      নাটকটি একটু গভীর অধ্যায়ন করলে বোঝা যায়- চাণক্য হলেন ‘পথপ্রদর্শক’ বা চালক, আর চন্দ্রগুপ্ত হলেন ‘পথিক’ বা লক্ষ্য। চাণক্যের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নন্দবংশ ধ্বংস করে চন্দ্রগুপ্তকে ভারতের সম্রাট পদে অধিষ্ঠিত করা। চাণক্য যদি 'বৃক্ষ' হন, চন্দ্রগুপ্ত তবে তার 'ফল'। ফল প্রাপ্তির মাধ্যমেই বৃক্ষের সার্থকতা। তাই চাণক্যের সমস্ত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু চন্দ্রগুপ্ত, সেহেতু চন্দ্রগুপ্তের নামেই নাটকের নামকরণ বেশি যুক্তিযুক্ত।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই নাটকে ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত এখানে কোনো একক ব্যক্তি নন, তিনি পরাধীন ভারতের মুক্তি-আকাঙ্ক্ষার এবং এক অখণ্ড ভারতবর্ষ গড়ার স্বপ্নের প্রতীক। আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত নাটকের ঘটনাপ্রবাহ, দ্বন্দ ও পরিণতি চন্দ্রগুপ্তকে আশ্রয় করেই সার্থকতা পেয়েছে। তাই নাটকটির নাম ‘চন্দ্রগুপ্ত’ রাখা সর্বাংশে যুক্তিযুক্ত, তাৎপর্যপূর্ণ ও সার্থক হয়েছে।

ঠিক এরূপ অস়ংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা,সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher Kabita Sundorbon YouTube channel SAMARESH SIR 





Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...