Skip to main content

 'কাব্যং গ্ৰাহ্যম্ অলঙ্কারৎ' এই অভিমত কতদূর সঙ্গত? তা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।



पश्चिमबंग राजकीय विश्वविद्यालय (WBSU)-এর চতুর্থ সেমিস্টারের বাংলা মেজর (Major) পাঠ্যসূচির অন্তর্গত **'সাহিত্যতত্ত্ব'** বা **'কাব্যতত্ত্ব'** অংশের জন্য এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় ১০ নম্বরের উপযোগী করে সঠিক তথ্য ও তাত্ত্বিক গভীরতা বজায় রেখে উত্তরটি নিচে প্রস্তুত করে দেওয়া হলো।

# 'কাব্যং গ্রাহ্যমলঙ্কারাৎ'—অভিমতটির যৌক্তিকতা বিচার

## ভূমিকা

ভারতীয় কাব্যতত্ত্বের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কাব্য সৌন্দর্যের স্বরূপ অনুসন্ধানে একাধিক কাব্য সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি ধারা হলো **'অলংকার সম্প্রদায়'**। এই অলংকার সম্প্রদায়ের আদি প্রবক্তা আচার্য বামন তাঁর বিখ্যাত *'কাব্যলঙ্কারসূত্রবৃত্তি'* গ্রন্থে কাব্যের সংজ্ঞা ও গ্রহণযোগ্যতা বিচার করতে গিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ঘোষণা করেছিলেন—

> **"কাব্যং গ্রাহ্যমলঙ্কারাৎ। সৌন্দর্যমলঙ্কারঃ।"**

> *(অর্থাৎ: অলংকারের জন্যই কাব্য গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, আর সৌন্দর্যই হলো অলংকার।)*

আচার্য বামনের এই উক্তিটি কাব্যতত্ত্বে অলংকারের গুরুত্বকে এক চরম সীমায় নিয়ে যায়। কিন্তু সার্থক কাব্যবিচারের নিরিখে এই অভিমতটি কতদূর সঙ্গত এবং পরবর্তীকালের আচার্যেরা এটিকে কীভাবে গ্রহণ বা খণ্ডন করেছেন, তা বিশদ আলোচনার অপেক্ষা রাখে।

## অলংকার সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও উক্তির তাৎপর্য

আচার্য বামন এবং তাঁর পূর্বসূরি আচার্য ভামহ, দণ্ডী প্রমুখ অলংকারবাদীদের মতে, অলংকার কেবল কাব্যের বাহ্যিক ভূষণ নয়, অলংকারই কাব্যের মূল চালিকাশক্তি। বামনের এই উক্তির গভীরার্থ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান দিক উন্মোচিত হয়:

 * **সৌন্দর্যই অলংকার:** বামন অলংকার শব্দটিকে দুটি অর্থে ব্যবহার করেছেন— ব্যাপক অর্থে এবং সংকীর্ণ অর্থে। ব্যাপক অর্থে অলংকার হলো 'সৌন্দর্য' (সৌন্দর্যমলঙ্কারঃ)। যা কিছু কাব্যের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে, তা-ই অলংকার। এই অর্থে অলংকার ছাড়া কাব্য কল্পনাই করা যায় না।

 * **কাব্যের গ্রহণযোগ্যতা:** সংকীর্ণ অর্থে অনুপ্রাস, উপমা, রূপক ইত্যাদি শব্দালংকার ও অর্থালংকারকে বোঝায়। বামনের মতে, সাধারণ লৌকিক বাক্য যখন অলংকারের ছোঁয়ায় অসাধারণ ও সুন্দর হয়ে ওঠে, তখনই তা কাব্য হিসেবে সমাজ বা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য বা 'গ্রাহ্য' হয়।

 * **দোষ বর্জন ও গুণ গ্রহণ:** অলংকারবাদীদের মতে, কাব্যকে অলংকৃত করার আগে তা দোষমুক্ত হওয়া প্রয়োজন এবং গুণান্বিত হওয়া প্রয়োজন। দোষহীন এবং গুণ ও অলংকারযুক্ত শব্দার্থই হলো কাব্য।

## পরবর্তীকালের আচার্যদের সমালোচনা ও খণ্ডন

বামনের এই চরমপন্থী অলংকারবাদী অভিমত কিন্তু ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বে চিরকাল নির্বিবাদে গৃহীত হয়নি। পরবর্তীকালের ধ্বনিবাদী ও রসবাদী আচার্যেরা এই মতের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং অলংকারকে কাব্যের বহিরঙ্গ বলে প্রমাণ করেছেন।

### ১. ধ্বনিবাদী আচার্য আনন্দবর্ধনের মত

*'ধ্বন‍্যালোক'* গ্রন্থের রচয়িতা আচার্য আনন্দবর্ধন দেখিয়েছেন যে, অলংকার কাব্যের আত্মা হতে পারে না। তিনি অলংকারকে কাব্যের শরীরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মানুষের মৃতদেহে গহনা বা অলংকার পরালে যেমন তার কোনো মূল্য থাকে না, তেমনই রসহীন কাব্যে অলংকারের আতিশয্য অর্থহীন। আনন্দবর্ধন বলেন— **অলংকার হলো 'অস্থিরধর্ম'**, যা কাব্যের আত্মা 'ধ্বনি' বা 'রস'-কে সাজানোর জন্য ব্যবহৃত হয় মাত্র।

### ২. রসবাদী আচার্য বিশ্বনাথ কবিরাজের মত

*'সাহিত্যদর্পণ'* গ্রন্থে আচার্য বিশ্বনাথ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অলংকারবাদীদের সমালোচনা করেছেন। তিনি কাব্যের সংজ্ঞা দিয়েছেন— **"বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম্"** (রসযুক্ত বাক্যই কাব্য)। অলংকারের স্থান নির্ণয় করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, অলংকার হলো মানুষের শরীরের অঙ্গদ বা বাজুবন্ধের মতো— যা কেবল বাইরের সৌন্দর্য বাড়ায়, কিন্তু মানুষের প্রাণ বা আত্মা নয় (উপকুর্বন্তি তং সন্তং অঙ্গদ্বৎ অলঙ্কারাঃ)।

## আধুনিক সাহিত্যের নিরিখে বিচার ও প্রাসঙ্গিকতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিক কালের কবি ও সমালোচকেরা অলংকারের চেয়ে কবির অনুভূতি ও রসসৃষ্টিকেই কাব্যের প্রধান শর্ত হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

 * বাস্তব জীবনে অনেক সময় অতি-অলংকরণ কাব্যের স্বাভাবিক গতি ও আবেগকে ব্যাহত করে।

 * তবে আচার্য বামনের উক্তিটির একটি গভীর সত্যতাও রয়েছে। আমরা যদি 'অলংকার' শব্দটিকে সংকীর্ণ অলংকার (উপমা-রূপক) হিসেবে না দেখে, বামনের ব্যাপক অর্থ অর্থাৎ **'সৌন্দর্য'** হিসেবে গ্রহণ করি, তবে উক্তিটি অত্যন্ত সঙ্গত। রস বা ভাবকে প্রকাশ করতে গেলেও শব্দ ও অর্থের যে সুষমা বা সৌন্দর্যের প্রয়োজন হয়, তা-ই তো অলংকার।

## উপসংহার





সার্বিক পর্যালোচনার শেষে বলা যায়, আচার্য বামনের **'কাব্যং গ্রাহ্যমলঙ্কারাৎ'** অভিমতটি আংশিক সত্য, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সত্য নয়। যদি অলংকার বলতে কেবল অনুপ্রাস, যমক বা উপমার যান্ত্রিক প্রয়োগ বোঝায়, তবে এই মত একেবারেই সঙ্গত নয়। কারণ রসহীন অলংকার কেবল চাতুর্য সৃষ্টি করে, সার্থক কাব্য নয়।

কিন্তু যদি অলংকারকে কাব্যের স্বতঃস্ফূর্ত রূপবন্ধ বা অভিব্যক্তিগত 'সৌন্দর্য' হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে উক্তিটি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। আধুনিক বিচারে বলা চলে— অলংকার কাব্যের প্রধান গ্রাহ্যতার কারণ বা কাব্যের আত্মা নয়, বরং তা কাব্যের প্রধান সহায়িকা। আত্মা যদি হয় 'রস', তবে অলংকার হলো সেই আত্মাকে প্রকাশ করার সুন্দরতম মাধ্যম। এই সামঞ্জস্যপূর্ণ বিচারেই বামনের উক্তিটির প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।

> **পরীক্ষার জন্য বিশেষ টিপস:** ১০ নম্বরের জন্য উত্তরটি লেখার সময় অলংকারবাদী ও রসবাদীদের দ্বন্দ্বটি (বামন বনাম আনন্দবর্ধন/বিশ্বনাথ) পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তুলবেন। সংস্কৃত কোটেশনগুলো খাতার মাঝখানে একটু স্পষ্ট করে লিখলে পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হবে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...