Skip to main content

সঙ্গতি বিধানের বিভিন্ন কৌশল বা প্রতিরক্ষণ কৌশল গুলি উদাহরণসহ আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।




পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর সিলেবাসের অন্তর্গত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো **সঙ্গতি বিধানের কৌশল বা প্রতিরক্ষণ কৌশল (Mechanisms of Adjustment or Defense Mechanisms)**।

মানুষ যখন তার পরিবেশ বা সমাজের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, তখন তার মধ্যে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা বা ফ্রাস্ট্রেশন (Frustration) তৈরি হয়। এই মানসিক অশান্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য এবং মনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য মানুষ অবচেতনভাবেই কিছু কৌশল অবলম্বন করে। মনোবিজ্ঞানী **সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud)** এবং পরবর্তীতে তার কন্যা **আনা ফ্রয়েড (Anna Freud)** এই কৌশলগুলিকে 'প্রতিরক্ষণ কৌশল' (Defense Mechanisms) হিসেবে অভিহিত করেছেন।

নিচে সঙ্গতি বিধানের প্রধান প্রধান কৌশলগুলি উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

## সঙ্গতি বিধানের প্রধান কৌশলসমূহ

এই কৌশলগুলিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—**ইতিবাচক বা প্রত্যক্ষ কৌশল** এবং **নেতিবাচক বা পরোক্ষ (প্রতিরক্ষণ) কৌশল**। সিলেবাস অনুযায়ী পরোক্ষ প্রতিরক্ষণ কৌশলগুলিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

### ১. যৌক্তিকতা প্রতিপাদন (Rationalization)

যখন কোনো ব্যক্তি তার ব্যর্থতার আসল কারণটি আড়াল করে সমাজগ্রাহ্য বা গ্রহণযোগ্য কোনো মনগড়া যুক্তি দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তাকে যৌক্তিকতা প্রতিপাদন বলে। একে চলিত ভাষায় 'অজুহাত দেখানো' বলা যেতে পারে। এটি দু-রকমের হয়:

 * **'আঙুর ফল টক' (Sour Grapes):** কোনো কাঙ্ক্ষিত বস্তু না পেলে তার মধ্যে খুঁত খোঁজা।

   * *উদাহরণ:* পরীক্ষায় ফেল করা কোনো ছাত্র যদি বলে, "এই ডিগ্রি দিয়ে আজকাল কোনো চাকরি পাওয়া যায় না, তাই ভালো করে পড়াশোনা করিনি।"

 * **'লেবু মিষ্টি' (Sweet Lemon):** নিজের অনিচ্ছাকৃত খারাপ পরিস্থিতিকেও ভালো বলে মেনে নেওয়া।

   * *উদাহরণ:* দামি গাড়ি কিনতে না পেরে কোনো ব্যক্তি যদি সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য বলে, "দামি গাড়ির চেয়ে সাইকেল চালানো স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো।"

### ২. দমন (Repression)

যেসব বেদনাদায়ক স্মৃতি, ব্যর্থতা, লজ্জাজনক ঘটনা বা অপূর্ণ ইচ্ছা আমাদের মনে কষ্ট দেয়, সেগুলিকে যখন আমরা অবচেতনভাবে মনের গভীরে বা অবচেতন মন (Unconscious mind)-এ ঠেলে দিই, তখন তাকে দমন বলে।

 * *উদাহরণ:* শৈশবের কোনো চরম ভীতিপ্রদ বা বেদনাদায়ক দুর্ঘটনার কথা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সম্পূর্ণ ভুলে যান, কারণ তার মন সেই কষ্টদায়ক স্মৃতিকে দমন করে রেখেছে।

### ৩. অবদমন (Suppression)

দমন যখন অবচেতনভাবে হয়, অবদমন তখন সচেতনভাবে ঘটে। ব্যক্তি যখন স্বেচ্ছায় এবং সচেতনভাবে কোনো কষ্টদায়ক চিন্তা বা ইচ্ছাকে মন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে, তখন তাকে অবদমন বলে।

 * *উদাহরণ:* বসের বকুনি খেয়ে প্রচণ্ড রাগ হওয়া সত্ত্বেও চাকরি বাঁচানোর তাগিদে হাসিমুখে সেই রাগ চেপে রাখা।

### ৪. প্রক্ষেপণ (Projection)

নিজের কোনো দোষ, খামতি বা অনৈতিক ইচ্ছার দায় নিজের ঘাড়ে না নিয়ে, তা অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে প্রক্ষেপণ বলে।

 * *উদাহরণ:* পরীক্ষায় খারাপ ফল করার পর কোনো ছাত্রের এমন দাবি করা যে, "শিক্ষক মহাশয় খাতা ভালো করে দেখেননি বা তিনি আমার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছেন।" (নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা)।

### ৫. স্থানচ্যুতি (Displacement)

যখন কোনো ব্যক্তি তার ক্ষোভ, রাগ বা আবেগ সরাসরি মূল উৎসের ওপর প্রকাশ করতে না পেরে কোনো কম শক্তিশালী বা নিরাপদ বিকল্প ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর প্রকাশ করে, তখন তাকে স্থানচ্যুতি বলে।

 * *উদাহরণ:* অফিসে বসের কাছে অপমানিত হয়ে এসে এক ব্যক্তি বাড়িতে তার নিরীহ স্ত্রীর ওপর চিৎকার করলেন বা কোনো শিশু তার বাবার ওপর রাগ করে নিজের খেলনাটি ভেঙে ফেলল।

### ৬. ক্ষতিপূরণ (Compensation)

জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রে নিজের দুর্বলতা বা ব্যর্থতাকে আড়াল করার জন্য, যখন কোনো ব্যক্তি অন্য একটি ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রম করে চরম সাফল্য অর্জন করার চেষ্টা করে, তখন তাকে ক্ষতিপূরণ বলে।

 * *উদাহরণ:* পড়াশোনায় অত্যন্ত দুর্বল বা অনুত্তীর্ণ কোনো ছাত্র যদি খেলাধুলো বা সংগীতে কঠোর পরিশ্রম করে রাজ্য স্তরে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে।

### ৭. উদগতি বা শোধন (Sublimation)

সমাজ দ্বারা অস্বীকৃত বা আদিম কোনো প্রবৃত্তিকে (যেমন—কাম বা হিংসা) যখন মানুষ কোনো গঠনমূলক, সৃজনশীল এবং সমাজস্বীকৃত কাজে রূপান্তরিত করে, তখন তাকে উদগতি বা শোধন বলে। এটিকে সবচেয়ে উন্নত প্রতিরক্ষণ কৌশল মনে করা হয়।

 * *উদাহরণ:* প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক বা হিংস্র স্বভাবের কোনো ব্যক্তি যদি সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একজন সফল বক্সার বা কুস্তিগীর হয়ে ওঠেন। অথবা, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কোনো ব্যক্তির কবি বা সাহিত্যিক হয়ে ওঠা।

### ৮. পশ্চাদগমন (Regression)

বর্তমান পরিস্থিতির কঠিন মানসিক চাপ বা সমস্যা সহ্য করতে না পেরে, কোনো ব্যক্তি যখন তার বয়সের তুলনায় অনেক ছোটদের মতো আচরণ (শিশুসুলভ আচরণ) করতে শুরু করে, তখন তাকে পশ্চাদগমন বলে।

 * *উদাহরণ:* কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর কান্নাকাটি করা বা আঙুল চোষা।

## শিক্ষাগত তাৎপর্য (Educational Significance)

শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় এই কৌশলগুলির ভূমিকা অপরিসীম:

 * **শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা বোঝা:** শিক্ষকেরা এই কৌশলগুলি লক্ষ্য করে বুঝতে পারেন কোন শিক্ষার্থী মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগছে।

 * **সহানুভূতিশীল আচরণ:** শিক্ষার্থীরা যখন প্রক্ষেপণ বা যৌক্তিকতার আশ্রয় নেয়, তখন তাদের শাস্তি না দিয়ে সহানুভূতির সাথে গাইড করা উচিত।

 * **সৃজনশীলতায় রূপান্তর:** শিক্ষার্থীদের অবদমিত শক্তিকে 'উদগতি' বা শোধনের মাধ্যমে খেলাধুলো, অঙ্কন বা সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত করা শিক্ষকের দায়িত্ব।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...