পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (WBSU)-এর প্রথম সেমিস্টারের বাংলা মাইনর (Minor) পাঠ্যসূচিতে **"অবক্ষয় যুগ" (বা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ)** এবং সেই সময়ের লোকরুচি ও নাগরিক সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি গানগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই অধ্যায় থেকে পরীক্ষায় মূলত **৫ নম্বর (টীকা/সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)** এবং **১০ নম্বরের (Broad Question)** প্রশ্ন আসে। নিচে পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের ধরন এবং কীভাবে উত্তর তৈরি করবেন, তার একটি স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হলো:
## ১. ১০ নম্বরের বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্ন (Broad Questions)
এই ধরনের প্রশ্নে সাধারণত কোনো একটি নির্দিষ্ট গানের ধারা এবং তৎকালীন কলকাতার সমাজচিত্রের ওপর তার প্রভাব জানতে চাওয়া হয়।
* **প্রশ্ন ১:** অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।
* **প্রশ্ন ২:** হাফ-আখড়াই ও খেউড় গান বলতে কী বোঝো? এই গানগুলির মাধ্যমে তৎকালীন কলকাতার বাবু সংস্কৃতির এবং সাধারণ মানুষের রুচির কীরূপ প্রতিফলন ঘটেছিল?
* **প্রশ্ন ৩:** অবক্ষয় যুগের কবিগান, টপ্পা ও হাফ-আখড়াই গানের সামাজিক ফলশ্রুতি বা সামাজিক প্রভাব সংক্ষেপে আলোচনা করো। তৎকালীন সমাজে এই গানগুলি কেন প্রশংসিত এবং সমালোচিত হয়েছিল?
## ২. ৫ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন / টীকা (Short Notes)
এই প্রশ্নগুলোতে কোনো একটি নির্দিষ্ট গানের ধারা, তার বৈশিষ্ট্য এবং প্রধান শিল্পীদের নাম উল্লেখ করতে হয়।
* **টপ্পা গান:** (রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর অবদান, টপ্পার মূল বৈশিষ্ট্য—প্রণয়মূলক গান)।
* **আখড়াই ও হাফ-আখড়াই গান:** (আখড়াই গানের সংস্কার করে কীভাবে হাফ-আখড়াই হলো, জুড়ান মিঞা ও মোহনচাঁদ বসুর ভূমিকা)।
* **খেউড় গান:** (খেউড়ের স্থূল রস, কবিগান বা তরজার অংশ হিসেবে এর ব্যবহার এবং লোকরুচির অবক্ষয়)।
* **নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত):** (বাঙালি টপ্পা গানের জনক হিসেবে তাঁর অবদান ও তাঁর গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য)।
## ৩. পরীক্ষার জন্য যেভাবে উত্তর প্রস্তুত করবেন (কৌশল ও কাঠামো)
পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য উত্তরের মধ্যে নিচের পয়েন্টগুলো অবশ্যই রাখা উচিত:
### ক. সামাজিক পটভূমি (অবক্ষয় যুগের কারণ)
পলাশীর যুদ্ধের পর নবাবী আমলের অবসান এবং ব্রিটিশ শাসনের সূচনাকালে সমাজে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, হঠাৎ বড়লোক হওয়া "বাবু" শ্রেণীর উদ্ভব এবং বনেদি সংস্কৃতির পতনের ফলে সমাজে এক ধরণের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় দেখা দেয়। উত্তর লেখার সময় এই পটভূমিটা ভূমিকা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
### খ. গানের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য
* **টপ্পা:** নিধুবাবুর হাত ধরে এটি মার্গ সঙ্গীত (শাস্ত্রীয় সঙ্গীত) থেকে বাঙালি মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে আসে। এর মূল বিষয় ছিল লৌকিক প্রেম। ("নানা দেশে নানা ভাষা, বিনে স্বদেশীয় ভাষা মেটে কি আশা?")
* **আখড়াই ও হাফ-আখড়াই:** আখড়াই ছিল অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ, জটিল গান। পরে সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য তাকে কিছুটা সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক করে 'হাফ-আখড়াই' করা হয়। এতে দলের মধ্যে গানের লড়াই হতো।
* **খেউড়:** এটি ছিল মূলত শৃঙ্গার রসাশ্রিত, অনেক সময় অত্যন্ত স্থূল এবং অশ্লীল শব্দসমৃদ্ধ গান। কবিগানের শেষাংশে বা আখড়াইয়ের আসরে সস্তা বিনোদনের জন্য এটি গাওয়া হতো।
### গ. সামাজিক ফলশ্রুতি (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ)
প্রশ্ন যদি "সামাজিক ফলশ্রুতি" নিয়ে আসে, তবে উত্তরের মূল ফোকাস থাকবে তৎকালীন সমাজের ওপর এই গানের ভালো ও মন্দ প্রভাবের ওপর:
* **নেতিবাচক দিক:** এই গানগুলোতে আধ্যাত্মিক বা উচ্চাঙ্গ দর্শনের অভাব ছিল। সস্তা চটুলতা, পরনিন্দা, এবং খেউড়ের অশ্লীলতা তৎকালীন সমাজের রুচির নিম্নগামিতা বা অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে। বাবুদের অর্থানুকূল্যে এই গানগুলো কেবলই সাময়িক চিত্তবিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
* **ইতিবাচক দিক:** এই গানগুলোর মাধ্যমেই প্রথম বাঙালি সংস্কৃতির ধর্মকেন্দ্রিকতা কেটে গিয়ে **ধর্মনিরপেক্ষ, লৌকিক ও মানবিক রূপ** প্রকাশ পায় (বিশেষ করে টপ্পা গানে)। এছাড়া সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা সাহিত্যের আসরে জায়গা করে নিতে শুরু করে, যা পরবর্তীকালে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত তৈরিতে সাহায্য করেছিল।
> **পরীক্ষার টিপস:** উত্তর লেখার সময় অবশ্যই **নিধুবাবু (টপ্পা)**, **জুড়ান মিঞা বা মোহনচাঁদ বসু (হাফ-আখড়াই)**-এর মতো ব্যক্তিত্বদের নাম এবং সম্ভব হলে দুই-এক লাইন গানের কলি (যেমন নিধুবাবুর স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার গান) কোটেশন হিসেবে ব্যবহার করবেন। এতে উত্তরের মান অনেক বেড়ে যাবে।
>
Comments
Post a Comment