সার্থক কাব্য সৃষ্টিতে রসের ভূমিকা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর সঠিক তথ্যমূলক উত্তরটি ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রয়োজন
কাব্যচর্চা বা সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাসে ‘রস’হলো কাব্যের আত্মা বা মূল প্রাণশক্তি। ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রে রসতত্ত্বের স্থান অত্যন্ত উঁচুতে। অলঙ্কার শাস্ত্রবিদ আচার্য বিশ্বনাথ তাঁর বিখ্যাত ‘সাহিত্যদর্পণ’গ্রন্থে কাব্য লক্ষণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন-“বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম্”অর্থাৎ রসযুক্ত বাক্যই হলো কাব্য। আনন্দদায়ী ও আবেগীয় এই রসের উপস্থিতি ব্যতীত কোনো সাহিত্যই সার্থক কাব্যের মর্যাদা পেতে পারে না। বস্তুত, কবির ভাবাবেগ যখন পাঠকের হৃদয়ে আনন্দময় অনুভূতি বা স্বাদের সৃষ্টি করে, তখনই সার্থক কাব্যের জন্ম হয়।আর সেখানে -
•রস কী ও রসের উৎস বিষয়ে আমরা দেখি-সাধারণ অর্থে রস হলো স্বাদ বা অনুভূতি। কিন্তু সাহিত্যবিচারে 'রস' কেবল জিভের স্বাদ নয়, এটি হৃদয়াবেগের এক অলৌকিক ও আনন্দময় রূপান্তর। মানব মনে কিছু স্থায়ী ভাব বা আবেগ সুপ্ত অবস্থায় থাকে-যেমন রতি (প্রেম), শোক, উৎসাহ, ভয়, ক্রোধ ইত্যাদি। অলঙ্কারশাস্ত্রের মতে, কবি যখন কাব্যে উপযুক্ত বিভাব (কারণ), অনুভাব (কার্য/প্রতিক্রিয়া) এবং সঞ্চারী ভাব (সহযোগী ভাব)-এর সমন্বয় ঘটান, তখন পাঠকের হৃদয়ে সুপ্ত সেই ‘স্থায়ী ভাব’টিই আস্বাদ্য রূপ লাভ করে 'রসে' পরিণত হয়।যেখানে-
আচার্য ভরতের ‘নাট্যশাস্ত্র’ গ্রন্থে রসের বিখ্যাত সূত্রটি উল্লেখ রয়েছে।“বিভাবানুভাবব্যভিচারিসংযোগাদ রসনিষ্পত্তি"- (অর্থাৎ, বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী বা সঞ্চারী ভাবের সংযোগেই রসের উৎপত্তি হয়।)
•প্রধান নয়টি রস (নবরস) ও কাব্যে এদের ভূমিকাঃসার্থক কাব্য সৃষ্টিতে বিভিন্ন ভাবের ওপর ভিত্তি করে প্রধানত নয়টি রসের (নবরস) উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। আর সেই রস গুলি হলো-
১)শৃঙ্গার বা মধুর রসঃএটি রসের রাজা বা 'রসরাজ'। নর-নারীর প্রেম ও আকর্ষণকে কেন্দ্র করে এই রস সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ-বৈষ্ণব পদাবলী বা কালিদাসের ‘মেঘদূতম্’।
২)করুণ রসঃপ্রিয়জনের বিচ্ছেদ বা শোকাচ্ছন্ন ভাব থেকে করুণ রসের জন্ম। উদাহরণ— মাইকেল মধুসূদন দত্তের *‘মেঘনাদবধ কাব্য’* (যেখানে রাবণ ও মন্দোদরীর পুত্রশোকে করুণ রস রূপায়িত)।
৩)বীর রসঃতেজস্বিতা, আত্মত্যাগ ও যুদ্ধক্ষেত্রের উৎসাহ থেকে বীর রস নিষ্পন্ন হয়।
৪) রৌদ্র রসঃ ক্রোধ ও হিংসা থেকে এ রসের সৃষ্টি।
৫)ভয়ানক রসঃ আতঙ্ক বা ভীতি থেকে এই রসের উৎপত্তি।
৬)বীভৎস রসঃ ঘৃণা বা জুগুপ্সা থেকে তৈরি হয়।
৭)হাস্য রসঃব্যঙ্গ, কৌতুক ও অসঙ্গতি থেকে এই রসে সমৃদ্ধ কাব্য রচিত হয় (যেমন— ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বা পরশুরামের কবিতা)।
৮)অদ্ভুত রসঃ বিস্ময় ও অলৌকিকতা থেকে এটি জন্ম নেয়।
৯)শান্ত রসঃসংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা এবং পরম আত্মিক শান্তি থেকে শান্ত রসের উদ্ভব (যেমন- উপনিষদ ও রবীন্দ্রকাব্যের অনেক আধ্যাত্মিক কবিতা)।
•সার্থক কাব্য সৃষ্টিতে রসের ভূমিকা•
•কাব্যকে শব্দাসাড়তা থেকে রক্ষা করাঃ অলঙ্কার, ছন্দ বা চমৎকার শব্দবিন্যাস কাব্যের বাহ্যিক রূপ তৈরি করে মাত্র। কিন্তু যদি কাব্যে রসের অভাব থাকে, তবে তা কেবল শুষ্ক শব্দজালে পরিণত হয়। রসই কাব্যকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
সাধারণ ভাবকে অলৌকিক আনন্দে রূপান্তরঃ কবির ব্যক্তিগত দুঃখ বা আনন্দ যখন কাব্যে রূপ পায়, তখন রসের প্রভাবে তা আর কবির ব্যক্তিগত থাকে না। অলঙ্কারশাস্ত্রের ভাষায় একে ‘সাধারণীকরণ’ বলে। এর ফলে কবির ব্যক্তিগত শোক বা প্রেম পাঠকের হৃদয়ে এক অলৌকিক ও সার্বজনীন নান্দনিক সুখে পরিণত হয়।
কাব্য ও পাঠকের সেতু বন্ধনঃ একজন পাঠক তখনই কোনো কাব্য বারবার পড়েন, যখন তিনি তার থেকে রসাস্বাদন করতে পারেন। সার্থক কাব্য পাঠককে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত করে এক নির্ভেজাল আধ্যাত্মিক বা নান্দনিক আনন্দলোকে (ব্রহ্মানন্দ সহোদর) নিয়ে যায়।
রসধ্বনি ও কাব্যের গভীরতাঃ ধ্বনিকার আনন্দবর্ধন তাঁর ‘ধ্বন্যালোক’গ্রন্থে বলেছেন যে, কাব্যের ব্যঙ্গার্থ বা ধ্বনি যখন রসকেন্দ্রিক হয় (রসধ্বনি), তখনই কাব্য সর্বশ্রেষ্ঠ বা সার্থক কাব্যে পরিণত হয়।
৪)বাংলা সাহিত্যে সার্থক কাব্য ও রসাস্বাদনঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগ যুগ ধরে সার্থক কবিরা রসাশ্রয়ী কাব্যই রচনা করে গেছেন:
•বৈষ্ণব পদাবলীঃ বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের পদাবলীতে শৃঙ্গার, বাৎসল্য ও করুণ রসের অপূর্ব সহাবস্থান ঘটেছে।
•মঙ্গলকাব্যঃচণ্ডীমঙ্গল ও মনসামঙ্গলে অন্যান্য রসের পাশাপাশি করুণ ও কৌতুকরসের মেলবন্ধন ঘটেছে।
•আধুনিক কাব্যঃ রবীন্দ্রকাব্যে (যেমন ‘সোনার তরী’, ‘গীতাঞ্জলি’) বিশ্বপ্রেম, সৌন্দর্য এবং শান্ত রসের এমন সুগভীর সমাবেশ ঘটেছে যা বিশ্বসাহিত্যে সার্থক কাব্য হিসেবে স্বীকৃত।
পরিশেষে বলা যায়, সার্থক কাব্য সৃষ্টির মূল শর্তই হলো ভাবকে রসে রূপান্তরিত করা। অলঙ্কার হলো কাব্যের গয়না, ছন্দ হলো তার চালচলন বা অঙ্গসৌষ্ঠব, কিন্তু রস হলো তার আত্মা। যে কাব্যে রসের প্রবাহ নেই, তা দেহ থাকলেও প্রাণহীন পুতুলের মতো। কবি যখন নিজের হৃদয়াবেগকে রসে পরিণত করে পাঠকের চিত্তে সংক্রামিত করতে পারেন, তখনই কাব্য সার্থকতা লাভ করে। তাই সাহিত্যবিচারে রস কেবল কাব্যের একটি উপাদান নয়-রসই সার্থক কাব্যের মূল চালিকাশক্তি ও অনস্বীকার্য ভিত্তি।
Comments
Post a Comment