কাব্য নির্মাণ।। কাব্য নির্মাণ কৌশলের তিন ভাগ, ভাগ গুলি কি কি? প্রসঙ্গত ভাগগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে কিভাবে রস নিষ্পত্তি হয় তা ব্যাখ্যা করো।
কাব্য নির্মাণ।। কাব্য নির্মাণ কৌশলের তিন ভাগ, ভাগ গুলি কি কি? প্রসঙ্গত ভাগগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে কিভাবে রস নিষ্পত্তি হয় তা ব্যাখ্যা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,কাব্যচর্চায় কেবল কবির মনের ভাবই যথেষ্ট নয়, সেই ভাবকে নান্দনিক রূপ দিতে কাব্য নির্মাণের নির্দিষ্ট কিছু কৌশল কাজ করে। কাব্যতত্ত্ব ও অলঙ্কারশাস্ত্রের নিরিখে কাব্য নির্মাণ কৌশলকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়- বিভাব, অনুভাব এবং সঞ্চারীভাব বা ব্যভিচারী ভাব। এই তিন উপাদানের উপযুক্ত সমন্বয়েই কাব্যে রসের নিষ্পত্তি ঘটে।
১) কাব্য নির্মাণ কৌশলের তিন ভাগ
•ক) বিভাবঃ যে উপাদান বা কারণের ওপর নির্ভর করে মানুষের হৃদয়ে সুপ্ত সুপ্ত স্থায়ী ভাবটি (যেমন: প্রেম, শোক, ভয় ইত্যাদি) জেগে ওঠে, তাকে বিভাব বলে। সহজ কথায়, বিভাব হলো রসের উদ্দীপক বা কারন।
বিভাব প্রধানত দুই প্রকার-•আলম্বন বিভাবঃ যাকে অবলম্বন করে ভাব জেগে ওঠে (যেমন: নায়ক-নায়িকা বা প্রিয় ব্যক্তি)।•উদ্দীপন বিভাবঃ যা সেই ভাবকে উস্কে দেয় বা বাড়িয়ে তোলে (যেমন: বসন্তের বাতাস, পূর্ণিমার চাঁদ, নির্জন স্থান ইত্যাদি)।
•খ) অনুভাবঃ বিভাবের প্রভাবে হৃদয়ে ভাব জাগার পর তা বাইরে যে অঙ্গভঙ্গি বা শারীরিক লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তাকে অনুভাব বলে। এটি হলো ভাবের কার্য বা প্রতিক্রিয়া।
উদাহরণঃপ্রেমে রোমাঞ্চ বা হাসিমুখ, শোকে অশ্রুপাত বা দীর্ঘশ্বাস, ভয়ে কাঁপন ইত্যাদি।
গ) সঞ্চারী ভাব বা ব্যভিচারী ভাবঃ স্থায়ী ভাব জেগে ওঠার পর তার সাগরে তরঙ্গের মতো ক্ষণিক ভেসে ওঠা ও মিলিয়ে যাওয়া চঞ্চল ভাবগুলোকে সঞ্চারী ভাব বলে। এরা স্থায়ী ভাবকে পুষ্ট করে আবার মূল ভাবে বিলীন হয়ে যায়। অলঙ্কারশাস্ত্রে এদের সংখ্যা ৩৩টি।
উদাহরণঃউৎকণ্ঠা, বিষাদ, লজ্জা, স্মৃতি, আশঙ্কা ইত্যাদি।
২) কিভাবে রস নিষ্পত্তি হয় (রসের উৎপত্তি):ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রের জনক আচার্য ভরত তাঁর বিখ্যাত ‘নাট্যশাস্ত্র’গ্রন্থে রস নিষ্পত্তির বিখ্যাত সূত্রটি প্রদান করেছেন-
“বিভাবানুভাবব্যভিচারিসংযোগাদ রসনিষ্পত্তি”
অর্থাৎ: বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী বা সঞ্চারী ভাবের সঠিক সংযোগেই রস নিষ্পন্ন হয়। আর সেখানে রস নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটি হলো-
১)সুপ্ত ভাবঃ মানুষের মনে ৮ বা ৯টি 'স্থায়ী ভাব' (রতি, শোক, উৎসাহ, ক্রোধ ইত্যাদি) সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
২)তিন কৌশলের সংযোগঃকাব্য পড়ার সময় যখন আলম্বন ও উদ্দীপন (বিভাব)-এর দ্বারা ভাবটি জাগ্রত হয়, পাত্র-পাত্রীর অঙ্গভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়া-এর মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয় এবং ক্ষণস্থায়ী আবেগসমূহ (সঞ্চারী ভাব)-এর দ্বারা পুষ্ট হয়-তখন সেই সাধারণ ভাবটি আর সাধারণ থাকে না।
৩)সাধারণীকরণ ও রস আস্বাদনঃ অলঙ্কারশাস্ত্রের ভাষায় একে ‘সাধারণীকরণ’বলে। এর ফলে কবির বা কাব্যের চরিত্রের ব্যক্তিগত দুঃখ-বেদনা পাঠকের হৃদয়ে এক অলৌকিক ও আনন্দময় স্বাদে পরিণত হয়। তখনই সুপ্ত 'স্থায়ী ভাবটি' রূপান্তরিত হয়ে 'রসে'পরিণত হয়। উদাহরণ-
কালিদাসের ‘শকুন্তলা’কাব্যে দুষ্যন্ত ও শকুন্তলা হলেন আলম্বন বিভাব, তপোবনের নির্জন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উদ্দীপন বিভাব, লজ্জাবনত চোখ বা অনুরাগপূর্ণ দৃষ্টিঅনুভাব, এবং বিরহ বা আশঙ্কার অনুভূতিগুলো সঞ্চারী ভাব। এই তিনের মেলবন্ধনে রতি নামক স্থায়ী ভাবটি জেগে উঠে‘শৃঙ্গার রসে’ নিষ্পন্ন হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, বিভাব হলো রসের বীজ বা কারণ, অনুভাব হলো তার অঙ্কুর বা বহিঃপ্রকাশ, এবং সঞ্চারী ভাব হলো তাকে বিকশিত করার জল-বাতাস। কাব্য নির্মাণের এই তিন কৌশল যখন নিপুণভাবে মিলে যায়, তখনই পাঠকের হৃদয়ে অলৌকিক রস আস্বাদন ঘটে এবং একটি কবিতা সার্থক কাব্যে রূপ নেয়।
Comments
Post a Comment