Skip to main content

শারীরশিক্ষা অর্থ ও সংজ্ঞা দাও। শারীর শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ফিজিক্যাল এডুকেশন মাইনর।

১. শারীরশিক্ষার অর্থ ও সংজ্ঞা (Meaning and Definition of Physical Education)

     আমরা সাধারণভাবে বলতে পারি যে,'শারীরশিক্ষা' বা 'Physical Education' শব্দটি দুটি শব্দের সমষ্টি।আর সেখানে Physical (শারীরিক) শব্দের অর্থ শরীরের গঠন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, শক্তি এবং ক্ষমতা।আর Education (শিক্ষা) শব্দের অর্থ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জ্ঞানার্জন এবং আচরণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন।আমরা আরও সহজ কথায় বলতে পারি-

     শারীরিক কসরত, খেলাধুলা এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে মানুষের শরীর ও মনের যে সামগ্রিক বিকাশ ঘটে, তাকেই শারীরশিক্ষা বলে। এটি কেবল হাত-পা নাড়ানো বা দৌড়াদৌড়ি নয়, বরং এটি শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ যা শরীরকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়।তবে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও ক্রীড়াবিজ্ঞানী শারীরশিক্ষার বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন।আর সেখানে জে. বি. ন্যাশ (J.B. Nash)-এর মতে-

 "শারীরশিক্ষা হলো শিক্ষার সেই বিশাল ক্ষেত্র, যা বড় পেশীসমূহের সঞ্চালন এবং তার সাথে সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়ার সাথে যুক্ত।"

       মোটকথা হলো-শারীরশিক্ষা হলো সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার উদ্দেশ্য হলো শারীরিক, মানসিক, আবেগগত এবং সামাজিক দিক থেকে উপযুক্ত নাগরিক গড়ে তোলা-যা বিভিন্ন শারীরিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

২. শারীরশিক্ষার লক্ষ্য (Aim of Physical Education)

শারীরশিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের সামগ্রিক বা সর্বাঙ্গীন বিকাশ।আমেরিকান শিক্ষাবিদ বুকওয়াল্টার-এর মতে, শারীরশিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো তিনটি। আর সেই তিনটি লক্ষ্য হলো-

 ১) সুস্বাস্থ্য (Health):শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা।

 ২) উপযুক্ত সময় ব্যবহার (Worthy use of leisure): অবসরের সঠিক ও গঠনমূলক ব্যবহার।

 ৩) নৈতিক চরিত্র (Ethical character): খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব ও সুনাগরিকত্বের বিকাশ।

         এক কথায়, একজন ব্যক্তিকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আবেগগতভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শারীরশিক্ষার একমাত্র চূড়ান্ত লক্ষ্য।

৩. শারীরশিক্ষার উদ্দেশ্যসমূহ (Objectives of Physical Education)

      আসলে আমাদের জীবনে লক্ষ্য হলো একটি চূড়ান্ত গন্তব্য, আর সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর ছোট ছোট ধাপ বা সিঁড়িগুলো হলো উদ্দেশ্য। বিখ্যাত শিক্ষাবিদ চার্লস এ. বুচার-এর ক্লাসিফিকেশন অনুযায়ী শারীরশিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যগুলোকে নিচে আলোচনা করা হলো-

ক. শারীরিক বিকাশজনিত উদ্দেশ্য (Physical Development)

 •অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উন্নতিঃনিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়ামের ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ (যেমন- হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, পেশীতন্ত্র) শক্তিশালী ও কার্যক্ষম হয়।

 •সহনশীলতা বৃদ্ধিঃ ক্লান্তি ছাড়া দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ক্ষমতা বা স্ট্যামিনা বাড়ে।

 •রোগ প্রতিরোধঃ শরীরকে রোগমুক্ত ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।

খ. স্নায়ু ও পেশীর সমন্বয়সাধন (Neuro-muscular Coordination)

 * মস্তিষ্কের নির্দেশ অনুযায়ী শরীরের পেশীগুলো যাতে দ্রুত ও সঠিকভাবে কাজ করতে পারে (যেমন- ক্রিকেট খেলায় বল দেখে ব্যাটে আঘাত করা), সেই সমন্বয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

 * শরীরের ভারসাম্য, গতি এবং নমনীয়তা (Flexibility) বৃদ্ধি পায়।

### গ. মানসিক বিকাশজনিত উদ্দেশ্য (Mental or Cognitive Development)

 * **দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা:** খেলার মাঠে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা শিক্ষার্থীর বুদ্ধিমত্তা ও উপস্থিত বুদ্ধি বাড়ায়।

 * **মনোসংযোগ বৃদ্ধি:** যেকোনো খেলায় ফোকাস বা মনোযোগ অত্যন্ত জরুরি, যা পড়াশোনাতেও সাহায্য করে।

 * মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং অবসাদ দূর করতে শারীরশিক্ষা সাহায্য করে।

### ঘ. সামাজিক বিকাশজনিত উদ্দেশ্য (Social Development)

 * **দলগত মনোভাব (Teamwork):** একসঙ্গে খেলার ফলে একে অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি হয়।

 * **নেতৃত্বের গুণাবলী:** দলের অধিনায়কত্ব বা দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণ বিকশিত হয়।

 * **সহযোগিতা ও সহমর্মিতা:** জয় বা পরাজয়কে সমানভাবে মেনে নেওয়া এবং বিপক্ষ দলকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সুনাগরিকত্বের শিক্ষা পাওয়া যায়।

### ঙ. আবেগগত বিকাশজনিত উদ্দেশ্য (Emotional Development)

 * মানুষের স্বাভাবিক আবেগ যেমন—রাগ, ভয়, হিংসা, আনন্দ ইত্যাদির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে শেখায়।

 * খেলার মাঠে কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রাখার অভ্যাস বাস্তব জীবনেও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

### উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শারীরশিক্ষাকে কেবল 'খেলার পিরিয়ড' হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একজন শিক্ষার্থীকে সুস্থ দেহ এবং সুস্থ মনের অধিকারী করে সমাজ ও দেশের একজন সম্পদশালী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...