কমেডি নাটকের স্বরূপ আলোচনা করো এবং বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক কমেডি নাটকের পরিচয় দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আমরা জানি যে,নাটক সাহিত্যের অন্যতম একটি দৃশ্যকাব্য। পাশ্চাত্য নাট্যতত্ত্বে নাটক মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। আর সেই দুটি ভাগ হলো- ট্রাজেডি (Tragedy) এবং কমেডি (Comedy)। যেখানে ট্র্যাজেডির মূল সুর করুণ ও গম্ভীর, সেখানে কমেডি নাটকের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের অসঙ্গতি, ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং দৈনন্দিন জীবনের হাস্যকর দিকগুলোকে তুলে ধরে দর্শক মনে নিছক আনন্দ ও হাসির উদ্রেক করা। তবে কমেডি কেবল উপরিস্তরের হাসি নয়, এর গভীরে থাকে সামাজিক জীবনের অসঙ্গতির প্রতি এক ধরণের সুক্ষ্ম রূপক ও তির্যক বার্তা।
•কমেডি নাটকের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য। গ্রীক শব্দ ‘Komoidia’ (Komos = উন্মুক্ত আনন্দানুষ্ঠান, Oide = গান) থেকে কমেডি শব্দের উৎপত্তি। কমেডি নাটকের মূল স্বরূপ বা লক্ষণগুলোকে নিম্নোক্তভাবে ভাগ করা যায়-
•লঘু ও আনন্দময় পরিণাম। ট্র্যাজেডির পরিণাম যেখানে করুণ ও মর্মান্তিক, কমেডির পরিণতি সেখানে মিলনাত্মক, আনন্দময় এবং সমাধানমুখী।
•চরিত্রের অসঙ্গতি ও ত্রুটি । কমেডির নায়ক বা চরিত্রগুলো অতিমানবীয় নয়; তারা সমাজেরই রক্তমাংসের মানুষ। তবে তাদের স্বভাব, চিন্তাভাবনা, সাজপোশাক বা কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো না কোনো অসঙ্গতি বা অতিরঞ্জন (Exaggeration) থাকে, যা হাসির সৃষ্টি করে।
•বুদ্ধিগ্রাহ্য হাস্যরস। প্রখ্যাত দার্শনিক বার্গসঁ (Henri Bergson)-র মতে, কমেডির হাসি মূলত বুদ্ধির হাসি। হৃদয়ের অনুভূতির চেয়ে মস্তিষ্কের বুদ্ধিবৃত্তি কমেডিতে বেশি সক্রিয় থাকে।
• সংঘাত ও জটলা। কমেডিতে ভুল বোঝাবুঝি, পরিচয় গোপন, ছদ্মবেশ বা আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং নাটকের শেষে হাস্যকর বা কৌশলী উপায়ে সেই জটিলতার অবসান ঘটে।
•সামাজিক অসঙ্গতির সংশোধন। একটি উচ্চমানের কমেডি নাটক কেবল প্রহসনমূলক সস্তা হাসি ছড়ায় না, বরং হাসির ছলে সমাজের ভণ্ডামি, কুসংস্কার বা মানবচরিত্রের দুর্বলতাকে সংশোধন করতে সাহায্য করে।
২.• সার্থক কমেডি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিরকুমার সভা’ (১৯২৬)
‘চিরকুমার সভা’ রবীন্দ্রকাব্য-নাটক গুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক প্রহসন বা হাস্যকৌতুক নাটক। অক্ষয় নামক এক রসিক যুবকের চালাকি এবং কিছু অবিবাহিত যুবকের (শ্রীশ, বিপিন, পূর্ণ) "চিরকুমার" থাকার কৃত্রিম ও অবাস্তব প্রতিজ্ঞাকে কেন্দ্র করে নাটকের কাহিনী গড়ে উঠেছে।আর সেখানে-
• হাস্যরস ও অসঙ্গতি।নাটকের প্রধান আকর্ষণ হলো যুবকদের চিরকুমার থাকার কঠোর ও কৃত্রিম প্রতিজ্ঞা এবং তার বিপরীতে নারীপ্রেমের স্বাভাবিক আকর্ষণের দ্বন্দ্ব। যুবকেরা মুখে নারীবিদ্বেষী কথা বললেও অন্তরে তারা নারীর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। অক্ষয়ের স্ত্রী পুরবালা এবং তার বোনদের (শৈলবালা, নৃপবালা, নীরবালা) চক্রান্তে এক এক করে চিরকুমার দলের সদস্যরা কীভাবে প্রেমের ফাঁদে পড়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়-তাতেই নাটকের প্রধান কৌতুক ও অসঙ্গতিটি ফুটে উঠেছে। এরই পাশাপাশি -
•চরিত্র সৃষ্টিতে হাস্যরস।চন্দ্রমাধব বাবু, অক্ষয়, কুমারসভা-র যুবকেরা এবং রসিকদাদা চরিত্রগুলির কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে উচ্চমানের বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হাস্যরস (Wit and Humour) তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অক্ষয়ের হাস্যরসাত্মক সংলাপ এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল কমেডিটিকে চরম সার্থকতা দিয়েছে।আর যার ফলে-
•মিলনাত্মক পরিণতি।কমেডির নিয়ম মেনে নাটকের শেষে চিরকুমার সভা ভেঙে যায় এবং একে একে সব যুবক বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়। জীবনের স্বাভাবিক নিয়মই যে কৃত্রিম প্রতিজ্ঞার চেয়ে বড়-আনন্দময় পরিণতির মাধ্যমে নাটকটিতে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে আমরা অবশ্যই বলতে পারি-'চিরকুমার সভা' নাটকে কোনো সস্তা ভণ্ডামি বা স্থূল শারীরিক কৌতুক নেই; এতে রয়েছে মার্জিত ও বুদ্ধিনির্ভর হাস্যরস। নাটকীয় সংঘাত, ভুল বোঝাবুঝি, রসাত্মক সংলাপ এবং আনন্দময় সমাপ্তির নিরিখে এটি বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী ও সার্থক কমেডি নাটক।
Comments
Post a Comment