Skip to main content

শজারুর কাঁটা উপন্যাসে(4th Sem) দীপা চরিত্রটি আপাততদৃষ্টিতে স্বার্থপর মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তার উত্তরণ ঘটেছে, বিষয়টি আলোচনা করো।

শজারুর কাঁটা উপন্যাসে দীপা চরিত্রটি আপাততদৃষ্টিতে স্বার্থপর মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তার উত্তরণ ঘটেছে, বিষয়টি আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মাইনর)।

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য উপন্যাস 'শজারুর কাঁটা'-য় দীপা চরিত্রটি একটি জটিল এবং বহুস্তরীয় চরিত্র। যেখানে গল্পের শুরুতেই আমরা দেখি,দীপার আচরণে একধরনের স্বার্থপরতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু উপন্যাসের শেষে তার মধ্যে যে মানবিক পরিবর্তন এবং মানসিক উত্তরণ ঘটে, তা সেই চরিত্রটিকে নিছক একজন নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, বরং বলা ভালো এই নেতিবাচক চরিত্র থেকে সে অনেক ঊর্ধ্বে নিজেকে তুলে ধরেছে।আর সেখানে আমরা দেখি- 

•আপাততদৃষ্টিতে দীপার চরিত্রের স্বার্থপরতার দিক-

বিলাসিতা অর্থলোভী দীপাঃ আমরা দীপা একজন ধনী পরিবারের মেয়ে এবং তার জীবনযাপনে বিলাসিতার ছাপ স্পষ্ট। সে তার ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ এবং পছন্দের বিষয়ে আপস করতে রাজি নয়। উপন্যাসের প্রথম দিকে তার আর্থিক নিরাপত্তার প্রতি অতিমাত্রিক আকর্ষণ দেখা যায়।

 দীপা চরিত্রের আত্মকেন্দ্রিকতার দিকঃ আত্মকেন্দ্রিকতা: দীপা প্রায়শই নিজের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। তার কথাবার্তা এবং আচরণে একধরনের শীতলতা এবং অন্যের প্রতি উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। সে যেন নিজের গণ্ডির বাইরে খুব বেশি ভাবতে চায় না।

 * সম্পর্কের প্রতি উদাসীনতা: তার স্বামী দেবের সঙ্গে তার সম্পর্ক ততটা গভীর বা আবেগপ্রবণ মনে হয় না। দেবের প্রতি তার আচরণে একধরনের দূরত্ব এবং আবেগহীনতা থাকে, যা তাদের দাম্পত্য জীবনের দুর্বলতা প্রমাণ করে।

 * ভয় ও আত্মরক্ষা: খুনের ঘটনার পর দীপার মধ্যে যে ভয় দেখা যায়, তা মূলত নিজের সুরক্ষার প্রতিই কেন্দ্রীভূত। সে নিজেকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে চায়, যা স্বাভাবিক হলেও তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় অন্যের জন্য উদ্বেগ ততটা প্রকট ছিল না।

উত্তরণ ও মানবিক পরিবর্তন:

উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ যত এগোয়, এবং খুনের রহস্য উন্মোচনের পথে দীপা যত বেশি জড়িয়ে পড়ে, ততই তার চরিত্রের গভীরতা উন্মোচিত হতে থাকে। তার মধ্যে যে পরিবর্তনগুলি আসে, সেগুলি তার মানবিক উত্তরণকে নির্দেশ করে:

 * ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের মুখোমুখি হওয়া: দীপা প্রথমদিকে ভয় পেয়ে সবকিছু এড়িয়ে যেতে চাইলেও, ধীরে ধীরে সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে শেখে। খুনের ঘটনার জটিলতা এবং তার নিজের সম্পৃক্ততা তাকে একরকম বাধ্য করে বাস্তবতাকে মেনে নিতে। এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা তার মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ।

 * সহানুভূতি ও অন্যের প্রতি উদ্বেগ: যদিও শুরুতে দীপা আত্মকেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু গোয়েন্দা প্রধান ব্যোমকেশের তদন্তের সময় এবং অন্যান্য চরিত্রের সংস্পর্শে এসে তার মধ্যে একধরনের সহানুভূতি জন্মায়। বিশেষত, দেবের প্রতি তার গোপন প্রেম এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর বেদনা দীপার মধ্যে মানবিকতার বীজ রোপণ করে।

 * ভালবাসার স্বীকৃতি ও শোক: উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্সে যখন দেবের প্রকৃত পরিচয় এবং তার অপরাধ প্রকাশিত হয়, তখন দীপা যে গভীর শোক এবং হতাশা অনুভব করে, তা তার অন্তরের প্রেম এবং সম্পর্কের প্রতি তার প্রকৃত অনুভূতিরই প্রমাণ। এই শোক তাকে স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। তার এই শোক কেবল স্বামীর হারানোর শোক নয়, বরং তার সঙ্গে তার অসম্পূর্ণ সম্পর্কের যন্ত্রণা এবং নিজের ভুলের উপলব্ধি।

 * নিজেকে পুনর্গঠনের চেষ্টা: উপন্যাসের শেষে দীপা যেন এক নতুন জীবন শুরু করার ইঙ্গিত দেয়। সে তার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতে আরও পরিণত ও দায়িত্বশীল হওয়ার পথে পা বাড়ায়। তার এই পরিবর্তন তাকে নিছক একজন ভুক্তভোগী থেকে একজন শক্তিশালী ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করে।

 * নৈতিক চেতনার জাগরণ: পরিস্থিতির চাপে এবং ব্যোমকেশের বিচক্ষণতার প্রভাবে দীপার নৈতিক চেতনার জাগরণ ঘটে। সে বুঝতে পারে যে শুধু নিজের স্বার্থ দেখা যথেষ্ট নয়, বরং জীবনের জটিলতা এবং সম্পর্কের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা প্রয়োজন।

উপসংহার:

দীপা চরিত্রটি শরদিনন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র। তার প্রাথমিক স্বার্থপরতা মানব চরিত্রের এক সাধারণ দুর্বলতা, কিন্তু উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ তাকে এমন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায় যেখানে সে নিজের ভুল উপলব্ধি করতে পারে এবং একজন পরিণত মানুষে রূপান্তরিত হয়। তার এই উত্তরণ প্রমাণ করে যে মানুষ কেবল পরিস্থিতির শিকার হয় না, বরং কঠিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সে নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং মানবিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ হতে পারে। দীপার চরিত্রটি এই ধারণারই প্রতিচ্ছবি যে, আপাতদৃষ্টিতে নেতিবাচক মনে হওয়া চরিত্রগুলিও সঠিক পরিস্থিতিতে নিজেদের ভিতরের সুপ্ত মানবিকতাকে জা

গ্রত করতে পারে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...