Skip to main content

বৌদ্ধ দর্শন মতে 'নির্বাণ লাভের উপায়' আলোচনা করো।

বৌদ্ধ দর্শন মতে 'নির্বাণ লাভের উপায়' আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চতুর্থ সেমিস্টার, দর্শন মাইনর)।

         নির্বাণঃ বৌদ্ধ দর্শন মতে নির্বাণ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে জীবনের সমস্ত দুঃখ, যন্ত্রণা এবং ক্লেশ (লোভ, ঘৃণা ও অজ্ঞতা) সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত বা দূর হয়।আসলে এটি কোনো স্বর্গ বা বিশেষ কোনো স্থান নয়।বরং বলা যেতে পারে যে, এটি একটি মানুষের মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা। নির্বাণ মূলত জীবনের দুঃখময় চক্র-জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু থেকে মুক্তি লাভ করা।আর সেখানে বৌদ্ধ দর্শন মতে -

           নির্বাণ লাভের উপায় হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা আটটি পথ অনুসরণ করা। আসলে এটি বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি এবং নির্বাণ লাভের একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।এই পথটি দুঃখ নিরোধের পথ, যা জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি এবং পরম শান্তি অর্জনের দিকে পরিচালিত করে।আর সেখানে অষ্টাঙ্গিক মার্গকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। সেই ভাগ গুলি হল-          ১)প্রজ্ঞাঃ প্রজ্ঞা হলো সঠিক জ্ঞান এবং দৃষ্টিভঙ্গি।যার মাধ্যমে ব্যক্তি বাস্তবতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে শেখে। সেই উপলব্ধিতে থাকে-

        সম্যক দৃষ্টিঃ সঠিক জ্ঞান বা দৃষ্টিভঙ্গি। এর অর্থ হলো চতুরার্য সত্য সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি। অর্থাৎ, জীবনের দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ এবং দুঃখ নিরোধের পথ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন। থাকে-

        সম্যক সংকল্পঃ সঠিক সংকল্প।যার অর্থ হলো সঠিক চিন্তা বা সংকল্প গ্রহণ করা।এর মধ্যে রয়েছে অহিংসা,ত্যাগ এবং প্রেম-করুণার মনোভাব।

২)শীলঃ বৌদ্ধ দর্শনে শীল হলো নৈতিক আচরণবিধি।যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে সঠিক কাজ করতে এবং নৈতিকভাবে শুদ্ধ থাকতে শেখে।আর সেই শুদ্ধতায় থাকে -

   সম্যক বাক্যঃ সঠিক বাক্য বা কথা।যার অর্থ হলো মিথ্যা, কঠোর, অপ্রয়োজনীয় এবং হিংসাত্মক কথা বলা থেকে বিরত থাকা। তাছাড়াও থাকে-

     সম্যক কর্মান্তঃ সঠিক কর্ম বা কাজ। এর অর্থ হলো কোনো ধরনের হিংসা, চুরি বা অনৈতিক যৌন আচরণ থেকে বিরত থাকা। থাকে-

    সম্যক আজীবঃ  সঠিক জীবিকা। এর অর্থ হলো এমন কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকা, যা অন্যদের ক্ষতি করে, যেমন অস্ত্র ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, বা কোনো ধরনের প্রতারণামূলক কাজ।

৩)সমাধিঃ এটি হলো মানসিক একাগ্রতা এবং ধ্যান। এর মাধ্যমে ব্যক্তি তার মনকে শান্ত করতে এবং আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে পারে।

   সম্যক ব্যায়াম ঃ সঠিক প্রচেষ্টা বা উদ্যম। এর অর্থ হলো সৎ চিন্তা এবং ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা করা এবং খারাপ চিন্তা ও অভ্যাস ত্যাগ করার চেষ্টা করা।

    সম্যক স্মৃতি (Samyak smṛti): সঠিক স্মৃতি বা মননশীলতা। এর অর্থ হলো বর্তমান মুহূর্তের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ রাখা এবং নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও শারীরিক অবস্থাকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

     সম্যক সমাধিঃ সঠিক সমাধি বা ধ্যান। এর অর্থ হলো গভীর ধ্যানের মাধ্যমে মনের একাগ্রতা অর্জন করা, যা নির্বাণ লাভের জন্য অপরিহার্য।

               পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, বৌদ্ধ দর্শনে এই আটটি পথ অনুসরণ করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ধীরে ধীরে তার মনের সকল কলুষতা, যেমন লোভ, ঘৃণা এবং অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হতে পারে এবং জীবনের দুঃখের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে নির্বাণ লাভ করতে পারে। সুতরাং বৌদ্ধ দর্শনে নির্বাণ হলো পরম শান্তি, যা জন্ম-মৃত্যুর চক্রের বাইরে অবস্থিত।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...