Skip to main content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজা নাটকটিতে 'রূপের মোহ'এবং 'অরূপের উপলব্ধি' কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা আলোচনা করো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজা নাটকটিতে 'রূপের মোহ'এবং 'অরূপের উপলব্ধি' কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর DS10,Unit-3)। 

          আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজা' নাটকটি একটি কালজয়ী রূপক-সাংকেতিক নাটক।যে নাটকে তিনি 'রূপের মোহ' (জাগতিক বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ) এবং 'অরূপের উপলব্ধি' (অদৃশ্য, অসীম বা সত্যের জ্ঞান) এই দুটি তত্ত্বকে কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।আর সেখানে রানী সুদর্শনা চরিত্রটির বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নাট্যকার এই আধ্যাত্মিক যাত্রাপথকে নির্দেশ করেছেন। সেই যাত্রাপথে আমরা দেখি-

      রূপের মোহ।সুদর্শনার ভুল যাত্রা এখানেই। রানী সুদর্শনাকে এই নাটকে মানবাত্মার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।যেখানে এই সুদর্শনা রাজাকে (ঈশ্বর বা পরম পুরুষকে) দেখতে চান তাঁর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপে। আর সেই ইন্দ্রিয়গ্ৰাহ্য রূপ হলো এ নাটকের 'রূপের মোহ'। আবার এর পাশাপাশি-

     •রাজার অদৃশ্যতা ও অন্ধকার ঘর। এ নাটকে রাজা সর্বদা একটি অন্ধকার ঘরে থাকেন। শুধু তাই নয়, তিনি দিনের আলোতে আসতে অস্বীকার করেন। আসলে এই অন্ধকার ঘরটি হলো মানুষের হৃদয়ের নিভৃত স্থান।যেখানে কেবল অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই রাজাকে উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু সুদর্শনা এই রহস্যময় অন্ধকারকে ঘৃণা করেন। যেখানে রূপক হিসেবে দেখানো হয়েছে রাজার অদৃশ্যমানতা। আর এই অদৃশ্য বোঝায় যে, ঈশ্বর বা সত্য কোনো বাহ্যিক আকার বা নির্দিষ্ট রূপে আবদ্ধ নন, তিনি নিরাকার। তবে -

         সুদর্শনার বাহ্যিক রূপের প্রতি আকর্ষণ।সুদর্শনা রাজাকে দেখতে চেয়ে ব্যাকুল হন। তিনি বিশ্বাস করেন যে,যা কিছু সুন্দর তা অবশ্যই দৃশ্যমান হবে।তাই সৌন্দর্যতৃষ্ণা তার কাছে মোহে পরিণত হয়। আর সেই মোহে সুদর্শনা দীপক ও কাঞ্চীরাজের রূপের মোহে অন্ধ হয়ে সুদর্শনা দুইবার ভুল করেন। যেখানে তিনি আলোর ঝলকানিতে প্রকাশিত দীপক রাজার আপাত-সুন্দর রূপকে রাজার আসল রূপ মনে করে ভুল করেন। অতঃপর কাঞ্চীরাজের প্রবল বাহুবল ও ঐশ্বর্য দেখেও তিনি বিভ্রান্ত হন এবং তার চক্রান্তের শিকার হন। যার ফলে -

        সুদর্শনাকে চরম অপমান ও দুঃখভোগ করতে হয়।আর এই বিপর্যয়গুলি প্রমাণ করে যে, কেবল বাহ্যিক রূপের ওপর নির্ভর করে সত্যকে খুঁজতে গেলে জীবনে যন্ত্রণা আসবে, আসবে দুঃখ। অপরদিকে-

   • অরূপের উপলব্ধি।দুঃখের দহন ও মুক্তির পথ হলো অরূপের উপলব্ধি। আর সেখানে রূপের মোহে দগ্ধ হওয়ার পর সুদর্শনা এক কঠিন আধ্যাত্মিক যাত্রার মধ্য দিয়ে অরূপের উপলব্ধি লাভ করেন। সেই উপলব্ধিতে তার মোহমুক্তি ও দুঃখের দহন হয়। যেখানে কাঞ্চীরাজ ও অন্যান্য রাজাদের হাতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার ফলে সুদর্শনার মিথ্যা অহংকার ও রূপের প্রতি তীব্র মোহ সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ হয়। অতঃপর এই দুঃখের আগুন তার সমস্ত জাগতিক আসক্তিকে ভস্মীভূত করে দেয়। অবশেষে-

         সুদর্শনার জাগতিক আসক্তি বিনষ্ট হলে রাজার প্রকৃত স্বরূপ আবিষ্কার হয়। শুধু তাই নয়,এই দহনের পরই সুদর্শনার কাছে রাজার প্রকৃত পরিচয় উদ্ভাসিত হয়।তিনি বুঝতে পারেন যে, রাজা কেবল সুন্দর নন, তিনি 'অনুপম'। তাই নাটকের শেষে তাকে বলতে শুনি-

    "তুমি সুন্দর নও প্রভু, সুন্দর নও, তুমি অনুপম।" 

          অর্থাৎ, তাঁর কোনো তুলনা নেই, তিনি সকল রূপকে ছাড়িয়ে যাওয়া সত্য। আসলে এই উপলব্ধি জানায় যে, ঈশ্বরকে কোনো একটি নির্দিষ্ট রূপে বাঁধা যায় না, তিনি সীমাহীন,অসীম। তাই রাজাকে 'দেখে' বা ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে সুদর্শনা তাঁকে 'সেবা' করার অধিকার চান। তিনি রানীর অধিকার নয়, বরং রাজার চরণের দাসী হতে চান।আর এখানেই-

      নাটকে রূপক হিসেবে ধরা পড়ে সুদর্শনার দাসীত্ব।যে'দাসীত্ব' বা নিঃস্বার্থ সেবার মনোভাবের মধ্য দিয়েই তিনি রাজার অরূপ, প্রেমময় ও কল্যাণময় সত্তাকে হৃদয়ে অনুভব করেন। অবশেষে-

         •অন্ধকার ঘরে শেষ মিলন। এই চূড়ান্ত উপলব্ধির মুহূর্তে রাজা অন্ধকার ঘরের দরজা খুলে দিয়ে সুদর্শনাকে 'আলোয়' আসতে বলেন। এই 'আলো' জাগতিক আলো নয়, বরং সত্যজ্ঞান ও প্রেমময় চেতনার আলো। এইবার সুদর্শনা ভয় পান না।বরং বলা যেতে পারে যে,রাজাকে তাঁর "অন্ধকারের প্রভু, নিষ্ঠুর, ভয়ানক" রূপে প্রণাম করেন।

          • পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'রাজা' নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে, মানবাত্মা (সুদর্শনা) প্রথমে জাগতিক সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যের (রূপের) মোহে আচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু দুঃখ, ভুল এবং আত্মত্যাগের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেই মোহ তার ভঙ্গ হয়। তখনই আত্মা উপলব্ধি করে যে, পরম সত্য (রাজা) কোনো নির্দিষ্ট রূপে সীমাবদ্ধ নন, তিনি অরূপ, প্রেমময় এবং সর্বত্র বিরাজমান। সুদর্শনার এই রূপ থেকে অরূপের পথে যাত্রা আসলে সকল মানুষের আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের প্রতীকী কাহিনি রাজা নাটকটি।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সাজেশন ব্যাখ্যা এবং টিউটোরিয়াল ভিডিও ক্লাস পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDORBON YOUTUBE CHANNEL 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...