Skip to main content

নবান্ন' নাটকটি বাংলা নাট্যসাহিত্য এবং গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে ঐতিহাসিক পটভূমিকায় এর গুরুত্ব গুরুত্ব আলোচনা করো।

'নবান্ন' নাটকটি বাংলা নাট্যসাহিত্য এবং গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে ঐতিহাসিক পটভূমিকায় এর গুরুত্ব গুরুত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,পঞ্চম সেমিস্টার, বাংলা মেজর, DS10,Unit-III)

১. নবান্ন নাটকটি সামাজিক বাস্তবতার দলিল। আমরা জানি যে, ইতিপূর্বে বাংলা নাটকে মূলত রাজা-রাজরা বা মধ্যবিত্ত সমাজের কাহিনি প্রাধান্য পেত।আর সেখানে 'নবান্ন' সর্বপ্রথম বাংলার গ্রাম ও কৃষক সমাজের রূঢ় বাস্তবতাকে, বিশেষত মন্বন্তরের ভয়াবহ চিত্রকে নাট্যকার মঞ্চে নিয়ে আসেন। সেই হিসেবে এটি সমাজজীবনের গভীর সংকটের এক বিশ্বাসযোগ্য দলিল হিসেবে চিহ্নিত।

২.নবান্ন নাটকটি গণনাট্য আন্দোলনের প্রবর্তনা। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এই নবান্ন নাটকটিকে মঞ্চস্থ করে।আর এই 'নবান্ন'- নাটকের হাত ধরেই বাংলা নাটকে এক নতুন ধারা, অর্থাৎ গণনাট্য আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তবে -

           এই নাটক কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং বলা যেতে পারে গণচেতনা জাগিয়ে তোলার এবং সমাজে পরিবর্তন আনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে, এই নাটকটির অভিনয় দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহেও সাহায্য করেছিল।

৩. নবান্ন নাটকটি শ্রেণীচেতনা ও প্রতিরোধের আহ্বান। এই নাটকে সমাজের শোষক ও শোষিত—এই দুই শ্রেণির সংঘাত স্পষ্ট হয়েছে। প্রধান সমাদ্দার বা গ্রামের সাধারণ কৃষকরা এককভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, নাটকের শেষে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং যৌথভাবে নতুন করে চাষ শুরু করার শপথ নেয় ('মন্বন্তরে মরিনি আমরা, মারী নিয়ে ঘর করি')। এটি নির্যাতিত শ্রেণির জাগরণ এবং প্রতিরোধের প্রতীক।

৪.নবান্ন নাটকটি আঙ্গিক ও শৈলীর অভিনবত্ব। 'নবান্ন' নাটকের গঠন ও মঞ্চসজ্জায় এক নতুনত্বের ছোঁয়া ছিল। প্রচলিত আখ্যানধর্মী নাটকের ধারা থেকে সরে এসে এটি দৃশ্য-নির্ভর, বাস্তবধর্মী এবং মুক্ত মঞ্চে অভিনয়ের উপযোগী আঙ্গিক গ্রহণ করে। জীবন্ত দৃশ্যপট, আলোকসম্পাত, শব্দক্ষেপণ এবং গণ-চরিত্রের ব্যবহার মঞ্চে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

৫. নবান্ন নাটকটিতে নায়কের ধারণায় পরিবর্তন।এই নাটকে কোনো একক নায়ক নেই। বরং প্রধান সমাদ্দার বা নিরঞ্জন দত্তের ব্যক্তিগত সংগ্রাম ছাপিয়ে সমগ্র কৃষক জনতাই যেন নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সমষ্টিগত মানুষের দুঃখ, হাহাকার এবং সবশেষে সম্মিলিত প্রতিরোধের সংকল্পই নাটকের মূল সুর।

          • পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'নবান্ন' নাটকটি তার ঐতিহাসিক পটভূমিকে আশ্রয় করে কেবল একটি সময়ের করুণ চিত্রই তুলে ধরেনি, বরং বাংলা নাটকের গতিপথ পরিবর্তন করে সামাজিক দায়বদ্ধতা, শ্রেণীচেতনা এবং গণ-আন্দোলনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...