Skip to main content

গীতিকাব্য কাকে বলে এবং তার বৈশিষ্ট্য কী কী, একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয় দাও।

গীতিকাব্য কাকে বলে এবং তার বৈশিষ্ট্য কী কী, একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয় দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

      •গীতিকাব্যঃ গীতিকাব্য হলো সাহিত্যের একটি বিশেষ রূপ, যেখানে কবির ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি, সুখ-দুঃখ এবং অন্তরের ভাবনা প্রকাশ পায়। এটি সাধারণত একটি সংক্ষিপ্ত কবিতা বা গান যা লেখকের হৃদয়ভাবকে সরাসরি তুলে ধরে।যেখানে-প্রাচীন গ্রিসে 'গীতিকাব্য' শব্দটি উদ্ভূত হয়েছিল, যেখানে 'লিরিক' শব্দটি এসেছে 'লাইর' নামক বাদ্যযন্ত্র থেকে। অর্থাৎ, এই ধরনের কবিতা সুর সহযোগে আবৃত্তি করা হতো।মোটকথা-

            গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য।

    •গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্যঃ

     ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন।

     ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন।

     ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়।

      ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়।

       ৫. ভাবের গভীরতা: সংক্ষিপ্ত হলেও, গীতিকাব্যে গভীর অর্থ ও ভাবনা থাকে। এটি পাঠকের মনে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে।

       ৬. উপমা ও অলঙ্কারের ব্যবহার: গীতিকাব্যে প্রতীক, রূপক, উপমা এবং বিভিন্ন অলঙ্কারের ব্যবহার দেখা যায়, যা কাব্যকে আরও সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলে।

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়ঃ সারদামঙ্গল কাব্য।

        আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিহারীলাল চক্রবর্তী রচিত 'সারদা মঙ্গল' কাব্যকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক গীতিকাব্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে উনিশ শতকে যখন বাংলা সাহিত্য মহাকাব্য ও আখ্যায়িকা কাব্যের ধারা থেকে সরে নতুন দিকে মোড় নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে 'সারদা মঙ্গল' কাব্যটি গীতিকাব্যের আঙিনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। আর সে কারণেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কাব্যকে 'ভোরের পাখি' বলে অভিহিত করেছিলেন। যেখানে সারদা মঙ্গল গীতিকাব্যটি বাংলা সাহিত্যের এই নতুন ধারার শুভ সূচনা করেছিল। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা সারদা মঙ্গল কে গীতিকাব্য বলছি তার কারন-

             •গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্যের নিরখে'সারদা মঙ্গল' কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির কাব্য। যে কাব্যটিতে কোনো নির্দিষ্ট গল্প বা কাহিনি নেই। তবে সেখানে আছে-কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী নিজে দেবী সারদার (জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী) প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। যে উক্তি ও ভালোবাসা কবির অন্তরের গভীর আনন্দের প্রকাশ। আর সেই ভালোবাসার মাঝে কবি নিজেকে প্রকৃতির মাঝে বিলীন করে সারদার সান্নিধ্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন। যেখানে পাই সারদা মঙ্গল কাব্যের-

             •বিষয়বস্তু ও ভাবের' দিক থেকে সারদা মঙ্গল' কাব্যটি মূলত তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। আর সেই ভাগ গুলি হল-•'নিসর্গ সন্দর্শন',• 'সঙ্গীত শতক' এবং •'সারদামঙ্গল'।

             •সারদা মঙ্গল কাব্যে 'নিসর্গ সন্দর্শন' অংশে কবি প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন। এখানে তিনি প্রকৃতিকে কেবল দৃশ্য হিসেবে দেখেননি, বরং বলা যেতে পারে যে,প্রকৃতির মধ্য দিয়ে এক অদৃশ্য ও রহস্যময় সত্তাকে অনুভব করেছেন, যা দেবী সারদা। প্রকৃতির অপরূপ রূপের মধ্য দিয়ে কবির হৃদয়ে এক ঐশ্বরিক অনুভূতি জেগে উঠেছে। পাশাপাশি-

           •'সঙ্গীত শতক' অংশে কবির আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। এখানে তিনি জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর ভাবনা প্রকাশ করেছেন, যা সুরের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে আমরা তৃতীয় ভাগে দেখি-

           •'সারদামঙ্গল' অংশে কবি সরাসরি দেবী সারদার বন্দনা করেছেন। তিনি সারদাকে কেবল জ্ঞানের দেবী হিসেবেই দেখেননি, বরং তাকে একজন চিরন্তনী নারী, প্রেমিকা এবং জীবনের সকল সৌন্দর্যের উৎস হিসেবে দেখেছেন।

           • সারদা মঙ্গল কাব্যের ভাষা ও ছন্দের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে,এই কাব্যের ভাষা অত্যন্ত সহজ, সাবলীল এবং স্বতঃস্ফূর্ত।তবে এখানে কবি বিহারীলাল ভারী সংস্কৃত শব্দ বা অলংকারের ব্যবহার এড়িয়ে চলেছেন।যার ফলে, কবির গভীর অনুভূতি সহজেই পাঠকের মনে প্রবেশ করে। কাব্যটিতে ছন্দ ও লয়ের একটি স্বাভাবিক প্রবাহ আছে, যা একে আবৃত্তির চেয়ে গাওয়ার উপযোগী করে তুলেছে।এই গীতিময়তাই কাব্যটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

            •রবীন্দ্র প্রভাবে আমরা দেখতে পাই যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বিহারীলালের এই কাব্য থেকে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়,তিনি 'সারদা মঙ্গল'-এর প্রশংসা করে বলেছিলেন-

      "সারদা মঙ্গল হলো 'নূতন ছন্দ, নূতন সুর, নূতন ভাষা, নূতন ভাব লইয়া বাংলা কাব্যের প্রথম অভ্যুদয়।" 

      •আমরা জানি রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায়, বিশেষত প্রকৃতির বর্ণনা এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশে, বিহারীলালের প্রভাব দেখা যায়। এই কাব্যটিই রবীন্দ্রনাথকে গীতিকাব্য রচনার দিকে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে এক দিগন্ত উন্মোচিত করে।

                •পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'সারদা মঙ্গল' কাব্যটি কেবলমাত্র একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং এটি বাংলা কাব্যের গতিপথ পরিবর্তনকারী একটি মাইলফলক। আর এটি প্রমাণ করে যে, কাব্য শুধু গল্প বা যুদ্ধের কাহিনি নয়, বরং কবির হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমও হতে পারে। সেই গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে সারদা মঙ্গল কাব্যের মধ্য দিয়ে। আসলে এই কাব্যের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্য মহাকাব্যের বন্ধন ভেঙে এক নতুন, আত্মগত ও গীতিময় ধারার জন্মলগ্ন সূচিত হয়।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 SAMARESH SIR.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...