জীবনানন্দ দাশের কবিতার ছন্দ প্রকৃতি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আমরা জানি যে,আধুনিক বাংলা কবিতার রূপকার জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) কেবল ভাবচিত্র বা রূপকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রেই নয়, ছন্দের প্রয়োগ ও উদ্ভাবনেও এক অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ছন্দের সুসংহত আভিজাত্য ও নিখুঁত জ্যামিতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে তিনি বাংলা ছন্দে এক গভীর নিবিড়তা, নির্জনতা, মন্থর গতি এবং কথ্যরীতির সহজ স্বাচ্ছন্দ্য দান করেন।আসলে জীবনানন্দের ছন্দ-সচেতনতা মূলত তাঁর কাব্যিক নির্জনতাবোধ, ঐতিহাসিক চেতনা ও সুররিয়্যালিস্টিক মানসিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এই কারণেই জীবনানন্দ দাশের কবিতার ছন্দপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ দেখতে পাই তাহলো-
• অক্ষরবৃত্ত বা যৌগিক ছন্দের আধিপত্য ও মন্থর লয়। আসলে জীবনানন্দ বাংলা ছন্দের তিন ধারাতেই (দলবৃত্ত, কলাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত) কবিতা লিখেছেন; কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ ও প্রতিনিধিত্বমূলক কাব্যকীর্তিগুলোতে অক্ষরবৃত্ত বা যৌগিক ছন্দের আধিপত্যই সবচেয়ে বেশি।তবে রবীন্দ্র-উত্তর যুগে অক্ষরবৃত্তের ওপর ভর করে তিনি এমন এক ছন্দোস্পন্দন তৈরি করেন, যার গতি দ্রুত বা চপল নয়-অতিশয় মন্থর। বলা যেতে পারে তার কবিতার এই গতি হল বাংলা কাব্য সাহিত্যের একটি বিরল বৈশিষ্ট্য। আর সেই কারণেই-
এই ধীর লয় তাঁর কবিতার বিষাদময়তা, অতীতে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা এবং ধূসর আবহকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
• দীর্ঘ পঙ্ক্তি বা প্রলম্বিত চরণের ব্যবহার।রবীন্দ্র-পূর্ব বা রবীন্দ্র-যুগের প্রচলিত ১৪ মাত্রার (৮+৬) পয়ার অক্ষরবৃত্তের সীমা অতিক্রম করে জীবনানন্দ ১৮ (৮+৮+৪), ২০ বা ২২ মাত্রার দীর্ঘ পঙ্ক্তি বা প্রলম্বিত চরণের প্রচুর ব্যবহার করেছেন। দীর্ঘ চরণ ব্যবহারের ফলে কবিতায় গদ্যের স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং কাহিনীর মতো প্রবহমানতা তৈরি হয়। আর সেখানে উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে-
"হয়তো আমাকে তুমি চিনিয়েছিলে কি এক পুরোনো ইতিহাসে,/"হয়তো বা কোনো এক রূপকথার পাণ্ডুলিপির পাতায়।"
• প্রবহমানতা ও কথ্যরীতির সংযোজন।জীবনানন্দের ছন্দের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রবহমানতা। কবিতার অর্থ বা ভাব এক চরণে শেষ না হয়ে অনায়াসে পরবর্তী চরণে গড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, তিনি কবিতার মধ্যে সাধারণ বাক্যালাপ বা কথ্যভঙ্গিকে যুক্ত করে ছন্দে নাট্যগুণ ও বাস্তবতার স্পর্শ এনেছেন-
"আমারে সে শুধালে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?/"পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।"
•গদ্যছন্দের আধুনিক ও অন্তর্লয়মুখী রূপায়ণ।পঞ্চাশের দশকের আধুনিক কাব্যভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনানন্দ গদ্যছন্দ কেঅত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর গদ্যছন্দ কোনো যান্ত্রিক বা শুকনো গদ্য নয়; তার ভেতরে একটি সূক্ষ্ম অন্তর্লয় বা লুকিয়ে থাকে। পর্বের বিন্যাস শিথিল রেখেও তিনি কবিতার সঙ্গীতময়তা বজায় রাখতে পেরেছিলেন।
• মুক্তক অক্ষরবৃত্ত ও অবচেতনের গতি প্রকাশ।‘আট বছর আগের একদিন’ বা ‘বোধ’ কবিতার মতো মনস্তাত্ত্বিক কবিতায় জীবনানন্দ মুক্তক অক্ষরবৃত্তের সাহায্য নিয়েছেন। মানুষের মনের অবচেতন ভাবাবেগ এবং জটিল চিন্তাধারাকে মুক্তক চরণের ছোট-বড় মাত্রিক বিন্যাসের মাধ্যমে উপস্থাপন করা ছিল তাঁর বিশেষ ছান্দসিক বৈশিষ্ট্য।
• সচেতন 'ছন্দপতন' বা ছান্দসিক ব্যতিরেক।জীবনানন্দ প্রায়শই প্রথাগত ছন্দের নিখুঁত মাত্রা-সমতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙেছেন। সনাতন ছন্দবিদগণ একে ‘ছন্দপতন’ মনে করলেও, আধুনিক ছন্দবিচারে এটি ছিল তাঁর কাব্যিক কৌশল। মনের অস্থিরতা, বিষাদ বা বিশেষ কোনো শব্দের ওপর জোর দেওয়ার জন্য তিনি হঠাৎ মাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটাতেন।
•কাব্যগ্রন্থভিত্তিক ছন্দের বিবর্তন।ঝরা পালক (১৯২৭) প্রারম্ভিক পর্ব-রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দের প্রভাব। দলবৃত্ত ও কলাবৃত্তের চপল ও ত্বরিত লয় দেখা যায়।ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬) জীবনানন্দের নিজস্ব ছান্দসিক ব্যক্তিত্বের আত্মপ্রকাশ। প্রবহমান অক্ষরবৃত্ত ও মন্থর গতির স্থায়ী সূচনা।বনলতা সেন (১৯৪২) অক্ষরবৃত্ত ও মুক্তক ছন্দের চরম উৎকর্ষ। কথ্যভঙ্গি ও ভাবসঙ্গীতের অপূৰ্ব মেলবন্ধন দেখা যায়।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি যে, জীবনানন্দ দাশের ছন্দ কোনো কৃত্রিম নিয়মকানুনের অন্ধ অনুকরণ নয়; বরং তা তাঁর নির্জনতা, অবসাদ এবং কালচেতনার একটি স্বাভাবিক ছান্দসিক অভিব্যক্তি। প্রথাগত ছন্দরীতির মধ্য থেকেই একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ‘জীবনানন্দীয় ছন্দোলয়’গড়ে তোলা বাংলা ছন্দশাস্ত্রের ইতিহাসে তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment