অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন।।অদ্বৈত বেদান্ত মতে 'অধ্যাস' বা 'অধ্যাসবাদ' বলতে কি বোঝায়? অধ্যাসের লক্ষণ ও শর্তগুলি আলোচনা করো।
অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে আচার্য শঙ্কর তাঁর বিখ্যাত ‘ব্রহ্মসূত্রভাষ্য’-এর সূচনাতেই ‘অধ্যাস’ (Adhyasa) তত্ত্বের অবতরণা করেছেন। অদ্বৈত দর্শনের পুরো ভবনটি এই অধ্যাসবাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কারণ অধ্যাসই হলো সমস্ত ভ্রম ও জাগতিক বন্ধনের মূল কারণ।
১. অধ্যাস বা অধ্যাসবাদ বলতে কী বোঝায়?
সহজ কথায়, এক বস্তুতে অন্য বস্তুর আরোপ বা ভুল ধারণাকেই ‘অধ্যাস’ বলা হয় ("অতস্মিন্ তদ্বুদ্ধিঃ অধ্যাসঃ"— যা যা নয়, তাতে সেই বোধ হওয়া)।
অদ্বৈত বেদান্ত মতে, যখন কোনো বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ না জেনে অবিদ্যা বা অজ্ঞানের কারণে সেখানে অন্য কোনো বস্তুর ধর্ম আরোপিত হয়, তখন সেই বিভ্রান্তিকর জ্ঞানকে অধ্যাস বা ভ্রম বলে।
* লৌকিক উদাহরণ: অন্ধকারে পড়ে থাকা দড়িকে (রজ্জু) না চিনে তাকে 'সাপ' মনে করা। এখানে দড়িতে সাপের অধ্যাস হয়েছে।
* দার্শনিক প্রয়োগ: পরমাত্মা বা ব্রহ্মের ওপর অনাদি অবিদ্যার প্রভাবে দৃশ্যমান জগত, দেহ, মন, অহংকার ইত্যাদির মিথ্যা আরোপ হওয়া। অদ্বৈত বেদান্তে বলা হয়, আত্মা বিশুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ, কিন্তু অধ্যাসের কারণে মানুষ "আমি স্থূল", "আমি দুঃখী" বা "আমি কর্তা/ভোক্তা" বলে মনে করে।
২. অধ্যাসের লক্ষণ (Characteristics of Adhyasa)
আচার্য শঙ্কর অধ্যাসের সার্বজনীন লক্ষণ দিতে গিয়ে বলেছেন: "স্মৃতিরূপঃ পরত্র পূর্বদৃষ্টাবভাসঃ"। এর মধ্যে তিনটি প্রধান বিষয় নিহিত রয়েছে:
* পরত্র অবভাস (অন্য বস্তুতে ভাসমান হওয়া): অধ্যাস সর্বদা অন্য একটি বস্তুর ওপর ঘটে। যেমন—দড়ির ওপর সাপের প্রকাশ।
* পূর্বদৃষ্ট (পূর্বে দেখা বিষয়): যে বস্তুর আরোপ করা হচ্ছে, তা পূর্বে কোথাও অভিজ্ঞাত হতে হবে। যেমন—পূর্বে কোথাও আসল সাপ না দেখলে দড়িতে সাপের ভ্রম হতো না।
* স্মৃতিরূপ (স্মৃতিশক্তির ন্যায় কিন্তু স্মৃতি নয়): সামনে বস্তু না থাকলেও স্মৃতির সংস্করণের কারণে পূর্বে দেখা বস্তুর আকার বর্তমানে আরোপিত বস্তুতে দেখা যায়। এটি ঠিক সরাসরি স্মৃতি নয়, কিন্তু স্মৃতির মতো অবভাসিত হয়।
৩. অধ্যাস ঘটার শর্তাবলি (Conditions for Adhyasa)
অদ্বৈত বেদান্ত মতে অধ্যাস বা ভ্রম ঘটার জন্য প্রধানত চারটি শর্ত থাকা আবশ্যক:
* অধ্যাস্যমান বস্তু ও অধিষ্ঠান (Subject & Substratum):
* অধিষ্ঠান: যার ওপর আরোপ ঘটে (যেমন—দড়ি বা আত্মা)।
* অধ্যাস্যমান বস্তু: যার আরোপ ঘটানো হয় (যেমন—সাপ বা দেহ-জগত)।
* অধিষ্ঠানের সামান্য জ্ঞান ও বিশেষ জ্ঞানের অভাব:
* অধিষ্ঠানটির 'সামান্য অংশ' জানা থাকতে হবে, কিন্তু 'বিশেষ অংশ' অজ্ঞাত থাকতে হবে।
* যেমন—অন্ধকারে দড়িটি দেখে "সামনে কিছু একটা আছে" (সামান্য জ্ঞান) বোঝা যায়, কিন্তু "এটি দড়ি" (বিশেষ জ্ঞান) তা বোঝা যায় না। সম্পূর্ণ অজানা বা সম্পূর্ণ জানা বস্তুতে অধ্যাস হয় না।
* দোষের উপস্থিতি (Presence of Defects):
* প্রমাণগত বা ইন্দ্রিয়গত দোষ: যেমন—অন্ধকার, দূরত্বের বাধা বা চোখের রোগ।
* মানসিক বা সংস্কারগত দোষ: ভয়, আগ্রহ বা পূর্বে দেখা কোনো গভীর স্মৃতি/সংস্কার।
* অবিদ্যা বা অজ্ঞান (Avidya/Ignorance):
* এটিই অধ্যাসের মূল উপাদান ও কারণ। পরমাত্মার ক্ষেত্রে এই অবিদ্যাই হলো মুল-অজ্ঞান, যার কারণে আত্মায় অ-আত্মার (দেহ-মন-জগৎ) অধ্যাস ঘটে।
> সংক্ষেপে: আচার্য শঙ্করের মতে, এই অধ্যাসই হলো জীবের সকল দুঃখ ও বন্ধনের কারণ। ব্রহ্মজ্ঞানের মাধ্যমে যখন অবিদ্যার নাশ ঘটে, তখন অধিষ্ঠানের (আত্মা/ব্রহ্ম) বিশেষ জ্ঞান উদিত হয় এবং সকল অধ্যাস বা ভ্রান্তির চিরতরে অবসান ঘটে।
>
Comments
Post a Comment