Skip to main content

বৈদিকযুগ।। ঋগ্বৈদিক যুগের 'দশ রাজার যুদ্ধ' সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো

বৈদিকযুগ।। ঋগ্বৈদিক যুগের 'দশ রাজার যুদ্ধ' সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় - সেমিস্টার ১ ইতিহাস মাইনর।

      ঋগ্বৈদিক যুগের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো 'দশ রাজার যুদ্ধ' (দাশরাজ্য যুদ্ধ)। ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে এই ঐতিহাসিক যুদ্ধের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। তৎকালীন ভরত গোষ্ঠীর রাজা সুদাসের সাথে অন্যান্য দশটি উপজাতির রাজাদের মধ্যে পরুষ্ণী (বর্তমান রবি বা রাভি) নদীর তীরে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।আর সেই যুদ্ধের কারণ হলো-

        পুরোহিত কেন্দ্রিক বিরোধ।যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল রাজপুরোহিত নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক। ভরত রাজ সুদাস তাঁর প্রধান পুরোহিত বিশ্বামিত্র-কে পদচ্যুত করে বিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান বশিষ্ঠ-কে রাজপুরোহিত পদে নিযুক্ত করেন। এতে বিশ্বামিত্র চরম অপমানিত বোধ করেন এবং সুদাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।

      আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার। ভরত গোষ্ঠী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশীল। পঞ্জাব ও সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্যান্য আয ও অনার্য উপজাতিগুলির সাথে ভরতদের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

      যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী ও জোট।অপমানিত বিশ্বামিত্র রাজা সুদাসের বিরুদ্ধে দশটি রাজবংশ বা গোষ্ঠীর একটি শক্তিশালী জোট গঠন করেন।আর তাদের মধ্যে পাঁচটি প্রধান আর্য গোষ্ঠী (পঞ্চজন): পুরু, যদু, তুর্বশ, অনু ও দ্রুহ্যু।আরপাঁচটি অনার্য গোষ্ঠী হলো- অলিন, পখথ, ভলানস, শিবি ও বিষাণিন।

        এই বিশাল জোটের নেতৃত্বে ছিলেন পুরু গোষ্ঠীর রাজা ত্রসদস্যু। অন্যদিকে, রাজা সুদাস বশিষ্ঠ মুনির পরামর্শ ও সহায়তায় একাই এই জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।

               •যুদ্ধের ঘটনাবলী ও ফলাফল•

      যুদ্ধটি পরুষ্ণী নদীর তীরে সংঘটিত হয়। বিশ্বামিত্রের নেতৃত্বাধীন অক্ষজোট নদীর জলপ্রবাহ ঘুরিয়ে দিয়ে সুদাসের সেনাবাহিনীকে নদীগর্ভে ডুবিয়ে মারার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু রাজা সুদাস অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও কৌশল অবলম্বন করে শত্রুপক্ষের সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করেন।যার ফলাফল-

      যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফলে রাজা সুদাস অসামান্য জয়লাভ করেন। বিরোধী জোটের নেতা পুরুরাজ নিহত হন এবং মিত্রজোটের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য-

       •  ভরত গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্যঃএই জয়ের ফলে সমগ্র উত্তর ভারতে ভরত গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব ও একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

     • 'ভারতবর্ষ' নামের উৎপত্তিঃ এই বিজয়ী ভরত গোষ্ঠীর নামানুসারেই পরবর্তীকালে সমগ্র উপমহাদেশের নাম হয় 'ভারতবর্ষ'।

      •কুরু রাজবংশের সূচনাঃপরবর্তীতে বিজিত ‘পুরু’ গোষ্ঠী এবং বিজয়ী ‘ভরত’ গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে নতুন এক শক্তিশালী উপজাতির জন্ম দেয়, যা ইতিহাস বিখ্যাত ‘কুরু’ গোষ্ঠী বা সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি পায়।

         মোট কথা হলো,ঋগ্বৈদিক যুগের বিচ্ছিন্ন উপজাতীয় শাসনব্যবস্থাকে অতিক্রম করে একটি একক কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভরত গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে 'দশ রাজার যুদ্ধ' ছিল একটি যুগান্তকারী অধ্যায়।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...