বৈদিক যুগ।। আর্যদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে যা জান লেখো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও বিতর্কিত বিষয় হলো ‘আর্য সমস্যা’ বা আর্যদের আদি বাসস্থান সংক্রান্ত আলোচনা। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্স দেখান যে সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন, গথিক ও পারসিক ভাষার মধ্যে ব্যাকরণগত ও শব্দগত গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। এই সাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে ইতিহাসবিদরা অনুমিত ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’ ভাষাভাষী মানবগোষ্ঠীকে ‘আর্য’ নামে চিহ্নিত করেন এবং তাদের মূল বাসভূমির সন্ধানে বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্ব প্রকাশ করেন।আর সেখানে-
আর্য শব্দের অর্থ ও প্রকৃতি হলো 'আর্য' কোনো জৈবিক বা শারীরিক জাতিগত পরিচয় নয়; এটি প্রধানত একটি ভাষাগত গোষ্ঠী। সংস্কৃত 'অর্' ধাতু থেকে উৎপন্ন 'আর্য' শব্দের সাধারণ অর্থ হলো সৎ, অভিজাত বা সম্মানীয় ব্যক্তি। এই প্রেক্ষিতে আর্যদের আদি বাসস্থান সংক্রান্ত প্রধান তত্ত্বসমূহ আমরা পাই তা হলো-
১)মধ্য এশিয়া তত্ত্ব। যেটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তথ্য হিসেবে বিবেচিত।জার্মান ভাষাতাত্ত্বিক ম্যাক্স মুলার প্রস্তাব করেন যে আর্যদের আদি বাসস্থান ছিল মধ্য এশিয়ার আরাল ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চল।আর সেখানে যুক্তি-
ঋগ্বেদে বর্ণিত পশুপালনভিত্তিক অর্থনীতি, ঘোড়ার ব্যাপক ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট কিছু বৃক্ষ (যেমন—ব birch/বার্চ) ও জলবায়ুর বর্ণনা মধ্য এশিয়ার পরিবেশের সাথে মেলে।এছাড়াও পাওয়া যায়-
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণঃকাস্পিয়ান সাগরের পূর্বাঞ্চলের আন্দ্রোনোভো সংস্কৃতি এবং ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এশিয়া মাইনরের বোঘাজকই শিলালিপি-তে ভৈদিক দেবতা ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও নাসত্যের উল্লেখ এই মতামতকে শক্তিশালী করে।
২)ইউরোপীয় তত্ত্বঃঅধ্যাপক পি. জাইলস, প্যানকা এবং উইলিয়াম জোন্সের মতে, আর্যদের মূল বাসস্থান ছিল ইউরোপের কোনো অঞ্চলে।সেখানে যুক্তি-
হাঙ্গেরি, দক্ষিণ রাশিয়া বা দানিউব নদীর অববাহিকাকে সম্ভাব্য কেন্দ্র মনে করা হয়। ইউরোপীয় ভাষাগুলির সাথে বৈদিক ভাষার কাঠামোগত মিল (যেমন: পিতৃ > Father, মাতৃ > Mother, ভ্রাতৃ > Brother) এই দাবির প্রধান ভিত্তি।
৩)ভারত তত্ত্ব বিশেষ করে আদি স্বদেশ ভারত তথ্যঃ ড. অবিনাশচন্দ্র দাস, ড. সম্পূরণানন্দ এবং পরবর্তীকালের কিছু ভারতীয় গবেষক মনে করেন আর্যরা ভারতেরই আদি বাসিন্দা ছিলেন।তাঁদের যুক্তি-
ঋগ্বেদে উল্লিখিত সপ্তসিন্ধু অঞ্চল (পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম ভারত) এবং সরস্বতী নদীর বিবরণকে ভিত্তি করে বলা হয় যে তারা বহিরাগত ছিলেন না, বরং ভারত থেকেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে বিশ্বব্যাপী ইতিহাসবিদদের বৃহৎ অংশ এই মতামতকে ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাবে সার্বিকভাবে গ্রহণ করেননি।
৪)সুমেরু বা আর্কটিক তত্ত্ব।ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক তাঁর 'The Arctic Home in the Vedas' গ্রন্থে দাবি করেন আর্যদের আদি বাড়ি ছিল উত্তর মেরু অঞ্চলে।আর সেখানে তাঁর যুক্তি-
ঋগ্বেদের কিছু সুত্রে ছয় মাসের দিন ও ছয় মাসের রাতের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা কেবল মেরু অঞ্চলেই সম্ভব। তবে আধুনিক ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মতটি সর্বজনগ্রাহ্য নয়।তবে মধ্য এশিয়া তত্ত্ব অনুসারে ম্যাক্স মুলার, ই. এইচ. মেয়ার পশুপালন, ঘোড়া ও বোঘাজকই শিলালিপি এবং ইউরোপীয় তত্ত্ব অনুসারে পি. জাইলস, প্যানকা ভাষাতাত্ত্বিক সামঞ্জস্য ও ভৌগোলিক শব্দাবলী সামনে আনেন। আবার আদি স্বদেশ ভারত অবিনাশচন্দ্র দাস, সম্পূরণানন্দ ঋগ্বেদের সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের ভূগোল এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা গেছে যে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে ইউরেশীয় স্টেপ অঞ্চল (South Russian Steppes) থেকে আর্যরা তরঙ্গাকারে পরিযায়ন (Migration) করেছিল। এটি কোনো এককালীন সশস্ত্র আক্রমণ ছিল না, বরং দীর্ঘদিনের ধীরে ধীরে ঘটা এক সাংস্কৃতিক সঞ্চারণ।
উপরিউক্ত আলোচনার পর্যালোচনায় বলা যায় যে, আর্যদের আদি বাসস্থান সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও তর্কসাপেক্ষ হলেও আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞানের সমন্বিত প্রমাণের ভিত্তিতে দক্ষিণ রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার স্টেপ অঞ্চলকেই আর্যদের আদি বাসস্থান হিসেবে গ্রহণ করা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। সেখান থেকেই পরিযায়নের মাধ্যমে তারা খণ্ড খণ্ড দলে বিভক্ত হয়ে ইউরোপ, পারস্য এবং ভারতে প্রবেশ করেছিল।
Comments
Post a Comment