Skip to main content

সার্বভৌমত্বের বহুত্ববাদী তত্ত্বটি আলোচনা করো।

বহুত্ববাদ।।  সার্বভৌমত্বের বহুত্ববাদী তত্ত্বটি আলোচনা করো। একত্ববাদের তুলনায় এটি কতটা গ্রহণযোগ্য?"পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনার।

         আমরা জানি যে,রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্রীয় ও বিতর্কিত ধারণা হলো 'সার্বভৌমত্ব'। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে  ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনায় জন অস্টিনের চরম একত্ববাদী সার্বভৌমত্ব ধারণার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সমাজে বহুত্ববাদী তত্ত্বের আত্মপ্রকাশ ঘটে। একত্ববাদ যেখানে রাষ্ট্রকে অসীম, নিরঙ্কুশ ও একক ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করে, বহুত্ববাদ সেখানে দাবি করে যে রাষ্ট্র সমাজের একমাত্র ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান নয়; রাষ্ট্র কেবল নানাবিধ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘের মধ্যে একটি সমন্বয়কারী সংস্থা মাত্র।আর সেখানে-

      বহুত্ববাদী তত্ত্বের মূল কথা হলো-সমাজ বহুমাত্রিক, তাই সার্বভৌমত্বও বহুধা বিভক্ত হওয়া উচিত। আর এই বহুত্ববাদের প্রধান সমর্থক হলেন- লাস্কি, আর্নেস্ট বার্কার, লিও দুগুই, মেটল্যান্ড, জি. ডি. এইচ. কোল প্রমুখ।যাদের মূল দৃষ্টিভঙ্গি হলো-মানুষ কেবল রাজনৈতিক সত্তা নয়, সে সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক জীবনও যাপন করে। ফলে সে বিভিন্ন সংঘ বা সমিতির (যেমন: ট্রেড ইউনিয়ন, ক্লাব, ধর্মীয় সংগঠন) সদস্য হয়। রাষ্ট্র যেমন মানুষের রাজনৈতিক চাহিদা পূরণ করে, ঠিক তেমনই এসব সমিতি মানুষের অন্যান্য প্রয়োজন মেটায়। আর এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সার্বভৌমত্বের বহুত্ববাদী তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো-

       ১) হলো 'সমিতিগুরাষ্ট্রলোর সমিতি'- বহুত্ববাদীদের মতে, রাষ্ট্র সমাজস্থ অন্যান্য সংঘের মতোই একটি সংঘ। তবে সমাজের বিভিন্ন ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা কিছুটা ভিন্ন, কিন্তু তা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বকে গ্রাস করতে পারে না।

      ২) ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণঃ একত্ববাদের চরম কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে বহুত্ববাদ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেয়। লাস্কির মতে, "যেহেতু সমাজ সংঘবদ্ধ ও বহুমাত্রিক, তাই সার্বভৌমত্বকেও বহুমাত্রিক ও বিকেন্দ্রীভূত হতে হবে।"

    ৩)রাষ্ট্র ও সমাজের ভিন্নতাঃ বহুত্ববাদীরা রাষ্ট্র এবং সমাজকে এক করে দেখেন না। সমাজ হলো এক বিশাল পরিধি, আর রাষ্ট্র হলো সেই সমাজেরই একটি অঙ্গ মাত্র। তাই রাষ্ট্রের ক্ষমতা সমাজের ওপর নিরঙ্কুশ হতে পারে না।

     ৪) আইনের উৎস ও রাষ্ট্রের সীমাঃ লিও দুগুই এবং ক্র্যাবে প্রমূখ চিন্তাবিদদের মতে, আইন রাষ্ট্রের সার্বভৌম ইচ্ছার ফসল নয়; বরং আইন গড়ে ওঠে সামাজিক প্রয়োজন ও নৈতিক বোধ থেকে। রাষ্ট্র কেবল সেই আইন প্রকাশ করে মাত্র, ফলে রাষ্ট্র নিজেও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

     একত্ববাদের তুলনায় বহুত্ববাদের গ্রহণযোগ্যতা বা মূল্যায়নের দিক থেকে অস্টিনের একত্ববাদী তত্ত্বের তুলনায় বহুত্ববাদী তত্ত্বটি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা বিশ্লেষণের সুবিধার্থে দুটি দিক থেকে বিচার করা যায়-

     ১)বহুত্ববাদের সবল দিক বা গ্রহণযোগ্যতাঃ একত্ববাদ রাষ্ট্রকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করে স্বৈরাচারের পথ সুগম করে। বহুত্ববাদ ক্ষমতার বণ্টন ঘটিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করে।

        আধুনিক জটিল ও বহুমাত্রিক সমাজে মানুষ রাষ্ট্র অপেক্ষা নিজ নিজ পেশাগত বা সামাজিক সংঘের প্রতি অনেক সময় বেশি অনুগত থাকে। বহুত্ববাদ এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে।

        অস্টিনের একত্ববাদ আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি শৃঙ্খলার বিরোধী। কিন্তু বহুত্ববাদ বিশ্বশান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেয়।

     ২)বহুত্ববাদের দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতাঃ সার্বভৌমত্বকে যদি বিভিন্ন সংঘের মধ্যে পুরোপুরি ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থের সংঘাত ঘটবে এবং রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে অরাজকতায় নিমজ্জিত হবে।

         বহুত্ববাদীরা রাষ্ট্রকে সমন্বয়কারী বললেও, একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্যান্য সংঘগুলোর বিরোধ নিষ্পত্তি করা অসম্ভব।

         আইনের পেছনে রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক ক্ষমতা না থাকলে আইন কেবল নীতিবাক্যে পরিণত হয়, যা বহুত্ববাদীরা উপেক্ষা করেছেন।

      পরিশেষে বলা যায় যে, একত্ববাদ ও বহুত্ববাদ উভয় তত্ত্বেরই নিজস্ব ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। অস্টিনের একত্ববাদ যেখানে রাষ্ট্রের আইনগত রূপ ও শৃঙ্খলার ওপর জোর দেয়, বহুত্ববাদ সেখানে সামাজিক বাস্তবতায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বিভিন্ন সংঘের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে চেয়েছে।তাই-

          একত্ববাদকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি বহুত্ববাদের গণতান্ত্রিক চেতনাকেও অস্বীকার করা যায় না। আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রে এই দুইয়ের এক ধরনের সুষম সমন্বয় দেখা যায়, যেখানে রাষ্ট্র চূড়ান্ত আইনের ক্ষমতার অধিকারী হলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মতামত ও স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করে চলে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •




Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...