বৈদিক যুগ।।"ঋগ্বৈদিক যুগ থেকে পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর অবস্থানের কী রূপ পরিবর্তন ঘটেছিল?"-আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রাচীন ভারতের ইতিহাস চর্চায় বৈদিক সমাজ ও সংস্কৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঋগ্বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ - ১০০০) থেকে পরবর্তী বৈদিক যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ - ৬০০) উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পাশাপাশি নারীসমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে এক ব্যাপক অবনতি ঘটে।আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
১)শিক্ষা ও উপনয়ন সংস্কার ও ঋগ্বৈদিক যুগ। ঋগ্বৈদিক যুগে নারীরা শিক্ষার সমান সুযোগ পেতেন। তাঁদের উপনয়ন সংস্কার বা সমাবর্তন হতো। লোপামুদ্রা, অপালা, ঘোষা, বিশ্ববারা-র মতো নারী পণ্ডিতরা বেদমন্ত্র পর্যন্ত রচনা করেছিলেন।যাঁদের বলা হতো 'ব্রহ্মবাদিনী'। তবে-
পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীদের উপনয়ন অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। নারীদের শূদ্রদের সমকক্ষ হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়।
২)বিবাহ ও পারিবারিক জীবন ও ঋগ্বৈদিক যুগ। বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল না; প্রাপ্তবয়স্কা নারীদের বিবাহ দেওয়া হতো। নারী নিজের পছন্দমতো পতি নির্বাচনের অধিকার (স্বয়ংবরা প্রথা) পেতেন। পুনর্বিবাহ ও বিধবা বিবাহ সমাজস্বীকৃত ছিল।তবে-
পরবর্তী বৈদিক যুগে বাল্যবিবাহের সূচনা হয় এবং পতি নির্বাচনের অধিকার বিলুপ্ত হয়। বহুবিবাহ (Polygamy) ব্যাপক রূপ নেয় এবং নারী কেবল সন্তান (বিশেষ করে পুত্রসন্তান) উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন।
৩)ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও ঋগ্বৈদিক যুগ। ঋগ্বৈদিক যুগে যেকোনো যজ্ঞ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্বামীর পাশে স্ত্রীর উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। স্ত্রীকে গৃহের প্রধান বা 'গৃহিণী' হিসেবে উচ্চ সম্মান দেওয়া হতো।তবে-
পরবর্তী বৈদিক যুগে জটিল যাগযজ্ঞের উত্থানের ফলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ গৌণ হয়ে পড়ে। শতপথ ব্রাহ্মণ-এ নারীকে "অশুভ" বা সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়।
৪. রাজনৈতিক অধিকার ও ঋগ্বৈদিক যুগ।সামাজিক ও রাজনৈতিক সভা-যেমন 'সভা' এবং 'বিদথ' -এ নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারতেন।তবে-
পরবর্তী বৈদিক যুগে রাজতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সভা ও সমিতি থেকে নারীদের পুরোপুরি অধিকারচ্যুত করা হয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা শূন্যে নেমে আসে।
৫. সম্পত্তির অধিকার ঋগ্বৈদিক যুগে নারীদের স্বতন্ত্র সম্পত্তির অধিকার না থাকলেও তাঁরা যৌতুক ও সামাজিক উপহারের (পারিবারিক সম্পদ) অংশ পেতেন।তবে-
পরবর্তী বৈদিক যুগে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও শক্ত হওয়ায় নারী পিতা, স্বামী বা পুত্রের ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ইতিহাসবিদ এ. এল. ব্যাশাম এবং আর. এস. শর্মা উল্লেখ করেছেন যে, পশুপালনভিত্তিক মুক্ত ঋগ্বৈদিক সমাজ যখন লোহার ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক ও বর্ণপ্রথানির্ভর পরবর্তী বৈদিক সমাজে রূপান্তরিত হয়, তখনই নারীর স্বাধীনতা ও সামাজ্যিক অধিকারের পতন ঘটে।
পরবর্তী বৈদিক যুগে 'গার্গী' ও 'মৈত্রেয়ী'-র মতো ব্যতিক্রমী বিদুষী নারী থাকা সত্ত্বেও, সার্বিকভাবে ঋগ্বৈদিক যুগের স্বাধীনতা ও মর্যাদার তুলনায় পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর অবস্থানের চরম অবক্ষয় ঘটেছিল।
Comments
Post a Comment