সবুজ পত্রের মুখপত্র।।"ইংরেজি শিক্ষার গুণেই আমরা দেশের লুপ্ত অতীতের পুনরুদ্ধারে ব্রতী হয়েছি।"- সবুজ পত্রের মুখপত্র প্রবন্ধে লেখকের এই মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।
সবুজ পত্রের মুখপত্র।।"ইংরেজি শিক্ষার গুণেই আমরা দেশের লুপ্ত অতীতের পুনরুদ্ধারে ব্রতী হয়েছি।"- সবুজ পত্রের মুখপত্র প্রবন্ধে লেখকের এই মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'সবুজ পত্র' পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (১৩২১ বঙ্গাব্দ) এই মুখপত্রটি লিখেছিলেন। এখানে তিনি আধুনিক বাঙালির মনন গঠনে এবং ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়নে ইংরেজি শিক্ষার ইতিবাচক ভূমিকার কথা ব্যক্ত করেছেন।আর সেখানে আমরা দেখি-
•ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিকতার মেলবন্ধনের প্রচেষ্টা। আসলে প্রাবন্ধিকের মতে, ইংরেজি শিক্ষা বাঙালি মানসে কেবল বিদেশি ভাষা শেখায়নি, বরং এক নতুন যুগচেতনা বা আধুনিকতার জন্ম দিয়েছে। মধ্যযুগীয় স্থবিরতা কাটিয়ে বাঙালি যখন ইউরোপীয় সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের সংস্পর্শে এলো, তখন তার মধ্যে এক প্রবল আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হলো। এই জিজ্ঞাসাই তাকে নিজের শেকড়ের সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছে।
•যুক্তিবাদ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির উন্মেষ ঘটানোর প্রয়াস।ইংরেজি শিক্ষার অন্যতম গুণ হলো যুক্তিবাদ। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের প্রভাবে বাঙালি শিক্ষিত সমাজ অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে যুক্তি দিয়ে সব কিছু বিচার করতে শিখল। এই যুক্তিবাদী মনোভঙ্গিই আমাদের বাধ্য করেছে ধুলোচাপা পড়ে থাকা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি, দর্শন ও সাহিত্যকে নতুন করে পাঠ করতে। ইংরেজি শিক্ষার আলোতেই আমরা আমাদের লুপ্ত গৌরবকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাজাতে পেরেছি। তাই আমরা পাই-
•প্রতীচ্যের আয়নায় প্রাচ্যের দর্শন।প্রমথ চৌধুরী বিশ্বাস করতেন যে, অন্যকে জানার মাধ্যমেই নিজেকে চেনা যায়। ইংরেজি শিক্ষার ফলে আমরা পাশ্চাত্য সাহিত্যের সংস্পর্শে এসে বুঝতে পারলাম যে, আমাদের দেশের উপনিষদ বা কালিদাসের কাব্য বিশ্বসাহিত্যে কতটা উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত। অর্থাৎ, পাশ্চাত্য শিক্ষার চশমা দিয়েই আমরা আমাদের হারানো ঐতিহ্যের প্রকৃত মূল্য নতুন করে আবিষ্কার করেছি।আর সেই পথ ধরেই-
•লুপ্ত অতীতের পুনরুদ্ধার।বাংলার নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিরা (যেমন—রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্র) সবাই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তাঁরাই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে ভারতের প্রাচীন সভ্যতার মহিমা তুলে ধরেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র বা রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ইতিহাসবিদরা পাশ্চাত্য প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতির সাহায্যেই ভারতের মাটির তলায় চাপা পড়া ইতিহাস উদ্ধার করেছেন। প্রমথ চৌধুরীর মতে, এই যে ঐতিহ্যের 'পুনরুদ্ধার', তা ইংরেজি শিক্ষার দান ছাড়া সম্ভব ছিল না।আর তার ফলেই-
গতির সঞ্চার ও জড়তা মুক্তি। আসলে লেখক মনে করতেন, ইংরেজি শিক্ষা আমাদের মনের জড়তা দূর করেছে। 'সবুজ পত্র' পত্রিকাটিও সেই সজীবতা ও যৌবনের প্রতীক। ইংরেজি শিক্ষার গুণে আমাদের চিন্তা একমুখী বা সংকীর্ণ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে বিশ্বমুখী। অতীতকে কেবল অন্ধভাবে ভক্তি না করে, তাকে আধুনিক জীবনের প্রয়োজনে কাজে লাগানোই ছিল এই শিক্ষার প্রকৃত গুণ।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,প্রমথ চৌধুরী ইংরেজি শিক্ষার অন্ধ অনুকরণকে প্রশ্রয় দেননি, বরং তার ভেতরের সারবস্তু বা 'প্রাণশক্তি'কে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ইংরেজি শিক্ষা আমাদের ঘরমুখো মনকে বিশ্বমুখী করেছে এবং সেই বিশ্বজনীন দৃষ্টি দিয়েই আমরা আমাদের দেশের লুপ্ত গৌরব ও প্রাচীন ঐতিহ্যকে সগৌরবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment