বৈদিক যুগ।। বৈদিক যুগের রাজনৈতিক সংগঠন ও শাসনব্যবস্থার বিবর্তন আলোচনা কর।(রাজা, সভা ও সমিতির ভূমিকা সহ)।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,বৈদিক যুগকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে রাজনৈতিক সংগঠন ও শাসনব্যবস্থার বিবর্তন আলোচনা করা হয়। আর সেখানে ঋগ্বৈদিক বা আদি বৈদিক যুগ (আনুমানিক ১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এবং পরবর্তী বৈদিক যুগ (আনুমানিক ১০০০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।আর এই প্রেক্ষিতে আদি বৈদিক যুগের রাজনৈতিক সংগঠন অর্থাৎ ঋগ্বৈদিক যুগে আর্যদের রাজনৈতিক জীবন ছিল মূলত উপজাতিভিত্তিক বা গোষ্ঠীভিত্তিক।আর সেখানে-
•রাজনৈতিক সংগঠনের স্তরঃ শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন একক ছিল ‘কুল’ বা পরিবার (প্রধান: কুলপ/গৃহপতি)। কয়েকটি কুল নিয়ে গঠিত হতো ‘গ্রাম’ (প্রধান: গ্রামণী), কয়েকটি গ্রাম নিয়ে ‘বিশ’ (প্রধান: বিশপতি) এবং একাধিক বিশ নিয়ে গঠিত হতো ‘জন’ বা উপজাতি (প্রধান: রাজন বা রাজা)।
•রাজার অবস্থান ও ক্ষমতাঃআদি বৈদিক যুগে রাজা বা ‘রাজন’ ছিলেন মূলত একজন উপজাতি প্রধান বা যুদ্ধনেতা। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। প্রজারা তাঁকে স্বেচ্ছায় ‘বলি’ নামক কর দিত। তাঁর প্রধান কাজ ছিল কৌরব বা গোষ্ঠীর ধনসম্পদ ও গবাদি পশু রক্ষা করা এবং যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া।
• শাসনতান্ত্রিক কর্মকর্তাঃ রাজাকে প্রশাসনে সাহায্য করতেন পুরোহিত (ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা), সেনানী (সেনাধ্যক্ষ) এবং স্পশ (চর বা গোয়েন্দা)।
• গণতান্ত্রিক সংস্থা: সভা ও সমিতি•
আমরা জানি যে,ঋগ্বৈদিক রাজতন্ত্র নিরঙ্কুশ ছিল না। আর সে কারণে সভা ও সমিতি নামক দুটি জনপ্রিয় সংস্থা রাজার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করত। ATHARVAVEDA-তে এদের “প্রজাপতির দুই কন্যা” বলা হয়েছে।আর সেখানে-
সভা ছিল বয়স্ক, অভিজ্ঞ এবং সমাজের এলিট বা অভিজাত শ্রেণীদের নিয়ে গঠিত পরিষদ।তবে এটি মূলত বিচার বিভাগীয় কাজ পরিচালনা করত এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজাকে পরামর্শ দিত। মহিলা (সবাবতী)-রাও এতে অংশ নিতে পারতেন।
সমিতি ছিল সমগ্র উপজাতি বা সাধারণ জনগণের জাতীয় পরিষদ। আর সেটির নতুন রাজা নির্বাচন, অপদার্থ রাজাকে পদচ্যুত করা এবং যুদ্ধ বা শান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত জানানো সমিতির কাজ ছিল। সমিতির সভায় রাজা নিজে উপস্থিত থাকতেন।এছাড়া ‘বিদথ’ নামে অপর একটি প্রাচীনতম গণপরিষদ ছিল, যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয় আলোচনা হতো।
পরবর্তী বৈদিক যুগের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বিবর্তন
পরবর্তী বৈদিক যুগে (সাম, যজু, অথর্ববেদ ও ব্রাক্ষণ সাহিত্যের যুগ) রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আর সেখানে রাষ্ট্রের ধারণা ও আয়তন বৃদ্ধি ঘটে।যাযাবর উপজাতি জীবন থেকে স্থায়ী কৃষিভিত্তিক জনপদে রূপান্তর ঘটে। ‘জন’ রূপান্তরিত হয় বড় আকারের ‘জনপদ’ বা আঞ্চলিক রাজ্যে (যেমন: কুরু, পঞ্চাল, মগধ)।এরই পাশাপাশি-
•রাজক্ষমতার বৃদ্ধি ও ঐশ্বরিক তত্ত্ব অনুসারে রাজার ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং রাজপদ বংশানুক্রমিক হয়ে ওঠে। রাজা নিজেকে ‘একরাট’, ‘সম্রাট’ বা ‘অধিপতি’ হিসেবে ঘোষণা করতেন। রাজসূয়, অশ্বমেধ ও বাজপেয় যজ্ঞের মাধ্যমে রাজা নিজের শাসনকে ধর্মীয় ও ঐশ্বরিক বৈধতা দিতেন।যেখানে-
কর ব্যবস্থায় দেখা যায় স্বেচ্ছায় প্রদত্ত ‘বলি’ পরবর্তী যুগে বাধ্যতামূলক করে রূপান্তরিত হয়। এছাড়া ‘ভাগ’ (উৎপাদিত শস্যের অংশ) ও ‘শুল্ক’ নামক কর আদায় করা হতো।তবে এখানে সভা ও সমিতির অবক্ষয় শুরু হয়।রাজক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সভা ও সমিতির গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। মহিলাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হয় এবং সাধারণ মানুষের মতামত প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। যার ফলে-
আমলাতন্ত্রের বিকাশ ঘটে।প্রশাসনিক কাজের জন্য ‘রত্নিন’ বা ১২ জন বিশিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার সূচনা হয় (যেমন: সংগৃহীতী বা কোষাধ্যক্ষ, ভাগদুঘ বা কর সংগ্রাহক, অক্ষবাপ ইত্যাদি)।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বৈদিক যুগে ভারতীয় মহাদেশে রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় উপজাতিভিত্তিক স্বৈরতন্ত্রহীন শাসনব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীভূত ও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল। সভা ও সমিতির প্রাথমিক গণতান্ত্রিক চরিত্র পরবর্তীতে লোপ পেলেও, এটি ছিল প্রাচীন ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি অনন্য নিদর্শন।
Comments
Post a Comment