Skip to main content

রাষ্ট্র কাকে বলে? রাষ্ট্রের মূল উপাদানগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো।

রাষ্ট্র কাকে বলে? রাষ্ট্রের মূল উপাদানগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর প্রথম সেমিস্টার।

         আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো 'রাষ্ট্র' (State)। মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে সুসংবদ্ধ ও সুনিয়ন্ত্রিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে।আর সেখানে ল্যাটিন শব্দ 'Status' থেকে ইংরেজি 'State' শব্দের উৎপত্তি।আসলে ১৬শ শতকে ইতালীয় রাজনৈতিক চিন্তাবিদ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The Prince'-এ প্রথম 'State' বা রাষ্ট্র শব্দটি আধুনিক অর্থে ব্যবহার করেন।তবে -

       রাষ্ট্রের সর্বজনগ্রাহ্য ও নিখুঁত সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন, কারণ বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এটিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন।আর সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক গার্নার এর মতে- 

    "রাষ্ট্র হলো কম-বেশি বিপুল সংখ্যক বিশিষ্ট এমন এক জনসমাজ, যারা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত বা প্রায় মুক্ত এবং যাদের একটি সুগঠিত সরকার আছে, যার প্রতি অধিবাসীদের অধিকাংশ স্বাভাবিক অনুগত্য প্রদর্শন করে।"

       আমরা সংক্ষেপে বলতে পারি যে, রাষ্ট্র হলো একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক সংগঠন, যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনসমাজকে সরকারের মাধ্যমে পরিচালনা করে।

       •রাষ্ট্রের মূল উপাদানসমূহ-অধ্যাপক গার্নারের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে রাষ্ট্রের ৪টি মৌলিক ও অপরিহার্য উপাদান পাওয়া যায়। এই উপাদানগুলির একটিও অনুপস্থিত থাকলে তাকে রাষ্ট্র বলা যায় না।আর সেই উপাদানগুলি হলো-

     ১) জনসংখ্যাঃ জনসংখ্যা হলো রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান মানবিক উপাদান। মানুষ ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্রের জনসংখ্যা কত হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সর্বসম্মত কোনো নিয়ম নেই। প্লেটোর মতে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের জনসংখ্যা হওয়া উচিত ৫,০৪০ জন এবং রুশোর মতে ১০,০০০ জন।তবে-

         আধুনিক যুগে সান মারিনো বা ভ্যাটিকান সিটির মতো অত্যন্ত কম জনসংখ্যার রাষ্ট্র যেমন রয়েছে, তেমনই ভারত বা চীনের মতো ১০০ কোটির বেশি জনসংখ্যার রাষ্ট্রও রয়েছে। তবে একটি রাষ্ট্র পরিচালনা ও সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত জনসংখ্যা থাকা আবশ্যক।

     ২) নির্দিষ্ট ভূখণ্ডঃ রাষ্ট্র গঠনের দ্বিতীয় ভৌগোলিক উপাদান হলো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড। একটি জনসমাজ স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট সীমানা প্রয়োজন।যার ভূখণ্ড বলতে কেবল স্থলভাগকে বোঝায় না; রাষ্ট্রের সীমানার অন্তর্গত স্থলভাগ, নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়, আকাশসীমা এবং সমুদ্র উপকূল থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত সামুদ্রিক অঞ্চল  এর অন্তর্ভুক্ত।তবে-

         ভূখণ্ডের আয়তন ছোট বা বড় হতে পারে। যেমন—কানাডা বা রাশিয়ার আয়তন বিশাল, আবার ত্যাটিকান সিটি বা টুভালুর আয়তন অত্যন্ত ক্ষুদ্র।

      ৩) সরকারঃ সরকার হলো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক যন্ত্র বা মাধ্যম। রাষ্ট্র যদি হয় একটি বিমূর্ত ধারণা, তবে সরকার হলো তার মূর্ত বা বাস্তব রূপ।যেখানে সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ইচ্ছা-সংকল্প প্রকাশিত ও রূপায়িত হয়। সরকার আইন প্রণয়ন করে, শাসন পরিচালনা করে এবং বিচার কাজ সম্পন্ন করে।তবে-

        সরকার ছাড়া রাষ্ট্র তার কার্যাবলী পরিচালনা করতে পারে না। সরকারের রূপ পরিবর্তন হতে পারে (যেমন: গণতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক, সংসদীয়), কিন্তু সরকার ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বজায় থাকা অসম্ভব।

    ৪)সার্বভৌমিকতাঃ সার্বভৌমিকতা হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণস্বরূপ উপাদান। এটি রাষ্ট্রকে অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক করে। সার্বভৌমিকতা হলো রাষ্ট্রের চরম, পরম ও চূড়ান্ত ক্ষমতা। এর দুটি রূপ রয়েছে-

      ক) অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমিকতাঃ এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে অবস্থানকারী সকল ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চূড়ান্ত আদেশ জারি করতে পারে এবং সকলকে আইন মানতে বাধ্য করে।

    খ) বাহ্যিক সার্বভৌমিকতাঃ এর অর্থ হলো রাষ্ট্র যেকোনো ধরনের বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণ, হস্তক্ষেপ ও পরাধীনতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে।

         উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে,জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমিকতা—এই চারটি উপাদানের সম্মিলিত রূপই হলো রাষ্ট্র। এর মধ্যে প্রথম দুটিকে ভৌগোলিক ও মানবিক ভিত্তি এবং শেষ দুটিকে রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি বলা হয়। এই চারটির যেকোনো একটির অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৪৭ সালের পূর্বে ভারতের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও জনসংখ্যা থাকলেও সার্বভৌমিকতা না থাকায় ভারত রাষ্ট্র ছিল না।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...