অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন (Advaita Vedanta) অংশের জন্য ২ নম্বর মানের গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর (Philosophy Minor)।
প্রশ্ন ১: অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রধান মুখপাত্র কে? তাঁর প্রধান গ্রন্থের নাম কী?
• উত্তর: অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রধান মুখপাত্র হলেন আদি শংকরাচার্য। তাঁর অন্যতম প্রধান ও বিখ্যাত গ্রন্থ হলো 'ব্রহ্মসূত্র ভাস্য'।
প্রশ্ন ২: 'অদ্বৈত' শব্দের অর্থ কী?
• উত্তর: 'অদ্বৈত' শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো 'দুই নয়' অর্থাৎ 'এক'। বেদান্ত দর্শনে এর অর্থ— পরম সত্তা বা ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়; ঈশ্বর, জীব ও জগতের মধ্যে কোনো প্রকৃত ভেদ নেই।
প্রশ্ন ৩: অদ্বৈত বেদান্ত অনুসারে 'ব্রহ্ম' কাকে বলে?
• উত্তর: অদ্বৈত বেদান্তে ব্রহ্ম হলেন জগতের একমাত্র পরম সত্তা বা পরম সত্য। তিনি নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত স্বভাব এবং 'সচ্চিদানন্দ' (সৎ, চিত ও আনন্দ স্বরূপ)।
প্রশ্ন ৪: 'সচ্চিদানন্দ' বলতে কী বোঝায়?
• উত্তর: সচ্চিদানন্দ তিনটি পদের সমন্বয়ে গঠিত:
• সৎ: যা সর্বকালে অবিনাশী ও সত্য।
•চিৎ: যা স্বপ্রকাশ ও পরম চেতনা।
• আনন্দ: যা পরম সুখ ও দুঃখহীন অবস্থা।
প্রশ্ন ৫: অদ্বৈত মতে 'মায়া' কী?
• উত্তর: মায়া হলো ব্রহ্মের একটি অনির্বচনীয় শক্তি, যার প্রভাবে অখণ্ড ব্রহ্ম জগৎরূপে প্রতিভাত হন। মায়ার দুটি প্রধান শক্তি রয়েছে- আবরণ শক্তি (সত্যকে ঢেকে রাখা) এবং বিক্ষেপ শক্তি (অসত্যকে সত্য বলে উপস্থাপন করা)।
প্রশ্ন ৬: শঙ্করাচার্যের মতে সত্তার তিনটি স্তর বা ত্রিবিধ সত্তা কী কী?
উত্তর: শংকরাচার্যের মতে সত্তার তিনটি স্তর হলো:
• পারমার্থিক সত্তা: যা সর্বকালে সত্য (যেমন- ব্রহ্ম)।
•ব্যবহারিক সত্তা: যা জাগতিক অভিজ্ঞতায় সত্য (যেমন-বিশ্বজগৎ)।
• প্রাতিভাসিক সত্তা: যা কেবল ভ্রান্তিতে দেখা যায় (যেমন- রজ্জুতে সর্প জ্ঞান বা স্বপ্নে দেখা বিষয়)।
প্রশ্ন ৭: 'অধ্যাস' (Adhyasa) কাকে বলে?
•উত্তর: এক বস্তুতে অন্য বস্তুর গুণ বা ধর্মকে ভুলবশত আরোপ করাকে অধ্যাস বলে। যেমন— অন্ধকারে দড়িকে সাপ মনে করা (রজ্জুতে সর্পজ্ঞান)। অদ্বৈত মতে, ব্রহ্মে এই জগতের স্মারোপই হলো মূল অধ্যাস।
প্রশ্ন ৮: অদ্বৈত বেদান্তে 'অনির্বচনীয়' বলতে কী বোঝায়?
•উত্তর: যা সৎ (সম্পূর্ণ সত্য) নয়, আবার অসৎ (সম্পূর্ণ মিথ্যা বা অলীক)-ও নয়, অর্থাৎ যাকে সত্য বা মিথ্যা কোনোভাবেই বর্ণনা করা যায় না, তাকে 'অনির্বচনীয়' বলা হয়। মায়া ও দৃশ্যমান জগৎ অদ্বৈত মতে অনির্বচনীয়।
প্রশ্ন ৯: 'রজ্জুতে সর্পজ্ঞান' দৃষ্টান্তে রজ্জু ও সর্প কিসের প্রতীক?
•উত্তর: অদ্বৈত দর্শনে-•রজ্জু (দড়ি): পারমার্থিক সত্য 'ব্রহ্ম'-এর প্রতীক। • সর্প (সাপ): অজ্ঞানতাজনিত মিথ্যা 'জগৎ'-এর প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: জীব ও ব্রহ্মের সম্বন্ধ বিষয়ে শঙ্করাচার্যের বিখ্যাত বাক্যটি কী?
• উত্তর: শঙ্করাচার্যের মতে- "ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা জীবো ব্রহ্মৈব না পরঃ"। অর্থাৎ, ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, জগৎ মিথ্যা এবং জীব প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্ম থেকে পৃথক কিছু নয়।
প্রশ্ন ১১: অদ্বৈত বেদান্তে 'মুক্ত' বা 'মোক্ষ' বলতে কী বোঝায়?
• উত্তর: অদ্বৈত দর্শনে অবিদ্যা বা অজ্ঞানের বিনাশ ঘটে যখন জীব বুঝতে পারে যে সে আর ব্রহ্ম অভিন্ন, সেই আত্মজ্ঞান লাভই হলো মোক্ষ। মোক্ষ কোনো নতুন প্রাপ্তি নয়, আত্মস্বরূপের অনুভূতি মাত্র।
প্রশ্ন ১২: জীবন্মুক্তি ও বিদেহমুক্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
• উত্তর: জীবন্মুক্তি: জীবিত অবস্থাতেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া।
• বিদেহমুক্তি: মৃত্যুর পর স্থূল ও সূক্ষ্ম শরীরের পাতের মাধ্যমে পূর্ণ মুক্তি লাভ করা।
প্রশ্ন ১৩: সগুণ ব্রহ্ম (ঈশ্বর) ও নির্গুণ ব্রহ্মের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
•উত্তর: নির্গুণ ব্রহ্ম: মায়াতীত, সর্বপ্রকার গুণ বা উপাধিশূন্য, নির্বিশেষ এবং পরমার্থ সত্য।
•সগুণ ব্রহ্ম (ঈশ্বর): মায় উপাধি-বিশিষ্ট ব্রহ্ম, যিনি গুণসম্পন্ন, জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের কর্তা এবং উপাসনার বিষয়।
প্রশ্ন ১৪: মায়ার দুটি প্রধান শক্তি কী কী এবং এদের কাজ কী?
•উত্তর: মায়ার দুটি শক্তি হলো-আবরণ শক্তি: যা বস্তুর প্রকৃত রূপ বা সত্যকে ঢেকে রাখে (যেমন— রজ্জুর আসল সত্তাকে ঢেকে ফেলা)।
বিক্ষেপ শক্তি: যা আবৃত বস্তুর ওপর অন্য বস্তুর কল্পনা বা মিথ্যা রূপ দান করে (যেমন-দড়ির ওপর সাপের প্রতীতি ঘটানো)।
প্রশ্ন ১৫: 'মায়া' ও 'অবিদ্যা'-র মধ্যে অদ্বৈত বেদান্তে কী পার্থক্য করা হয়?
•উত্তর মায়া: সত্ত্বগুণপ্রধান এবং এটি ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের উপাধি, যার ওপর ঈশ্বরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে।
অবিদ্যা: মলিন সত্ত্ব বা তমোগুণপ্রধান এবং এটি জীবের উপাধি, যার দ্বারা জীব মোহগ্রস্ত ও বন্ধনপ্রাপ্ত হয়।
প্রশ্ন ১৫: অধ্যাসের মূল কারণ কী? অধ্যাস কত প্রকার?
•উত্তর: অধ্যাসের মূল কারণ হলো অজ্ঞান বা অবিদ্যা অদ্বৈত মতে অধ্যাস প্রধানত দুই প্রকার-
•স্বরূপাধ্যাস (এক বস্তুর স্বরূপকে অন্য বস্তু মনে করা)
•সংসর্গাধ্যাস (এক বস্তুর ধর্মকে অন্য বস্তুতে আরোপ করা)।
প্রশ্ন ১৬: "ব্রহ্ম বিবর্ত উপাদান কারণ"— উক্তিটির অর্থ কী?
• উত্তর: অদ্বৈত বেদান্তে কার্য-কারণ তত্ত্ব হিসেবে বিবর্তবাদ স্বীকার করা হয়। এর অর্থ হলো— ব্রহ্ম নিজের কোনো প্রকৃত পরিবর্তন ছাড়াই (অপরিণামী থেকে) কেবল মায়ার প্রভাবে জগৎরূপে প্রতিভাত বা দৃশ্যমান হন। তাই ব্রহ্ম জগতের বিবর্ত উপাদান কারণ।
Comments
Post a Comment