আরাকান রাজসভার কবি সৈয়দ আলাওলের কবি কৃতিত্ব আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সপ্তদশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আরাকান (রোসাং) রাজসভার শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রতিভাধর কবি ছিলেন সৈয়দ আলাওল। মধ্যযুগের ধর্মকৈশিক ও মঙ্গলকাব্যনির্ভর বাংলা সাহিত্যের ধারায় আলাওল মানবিক প্রেমকাব্য, পাণ্ডিত্য এবং অনুবাদ-শিল্পের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।তাই তার কাব্যেদেখতে পাই-
•ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার উদ্ভাস।মধ্যযুগের অধিকাংশ কবি যখন দেব-দেবীর অলৌকিক মহিমা (মঙ্গলকাব্য) প্রচারে ব্যস্ত, তখন আলাওল মুসলিম কবিদের প্রচলিত ধারায় মানব-মানবীর লৌকিক প্রেমকে সাহিত্যের মূল উপজীব্য করেন। দেবকেন্দ্রিকতার উর্ধ্বে উঠে মানুষকে কাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রে উপস্থাপন করা তাঁর অন্যতম বড় কৃতিত্ব। শুধুমাত্র তাই নয় তার কাব্যে আমরা আরও দেখতে পাই-
•অনুবাদের স্বাধীনতা ও মৌলিকতা।আলাওল মূলত ফার্সি ও হিন্দি কাব্যের অনুবাদক হলেও তাঁর রচনা কেবল আক্ষরিক অনুবাদ ছিল না। তিনি মূল কাহিনীর কাঠামোর মধ্যে তৎকালীন বাঙালি সমাজ, আচার-অনুষ্ঠান, পোশাক-পরিচ্ছদ ও রীতিনীতির রূপায়ণ ঘটিয়ে সেটিকে বাঙালি জীবনের রসে জারিত করেছিলেন।আর সেখানে-
•আলাওলের প্রধান প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য আসন দখল করে নিয়েছে। যেখানে-আলাওল তাঁর পৃষ্ঠপোষক আরাকান রাজসভার অমাত্যদের অনুপ্রেরণায় বহু মূল্যবান কাব্য রচনা করেন-
•পদ্মাবতী (১৬৫১)। মালিক মুহম্মদ জায়সীর হিন্দি ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে রচিত আলাওলের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। চিতোরের রাজা রত্নসেন ও সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতীর প্রেমকাহিনী এতে অপূর্ব কাব্যসুষমায় ফুটে উঠেছে।
• সতীময়না-লোর-চন্দ্রানী (উত্তরভাগ)।কবি দৌলত কাজীর অসমাপ্ত কাব্য সম্পন্ন করে আলাওল তাঁর কাহিনী-সংযোজন দক্ষতা ও কাব্য প্রতিভার পরিচয় দেন।
• সৈফুলমুলুক বদিউজ্জামাল: রাজপুত্র ও পরী রাজকন্যার এক রোমান্টিক রূপকথামূলক প্রেমকাব্য।আবার অন্যান্য অনুবাদকর্ম হিসেবে ফার্সি কাব্য থেকে অনূদিত ‘সপ্তপয়কর’ (হাফ্ত পেকার), ‘সিকান্দরনামা’ এবং ধর্মশাস্ত্রভিত্তিক ‘তোহফা’। আর এই সকল কাব্য রচনার মধ্যে আমরা পাই আলাওলের-
•পাণ্ডিত্য ও বহুমুখী জ্ঞান।আসলে আলাওল কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বহুভাষাবিদ ও মহাপণ্ডিত। তিনি আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত, হিন্দি ও বাংলা ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন। এছাড়া জ্যোতিষশাস্ত্র, কামশাস্ত্র, অশ্বশাস্ত্র এবং সঙ্গীতশাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞান কাব্যের ছত্রে ছত্রে লক্ষ্য করা যায়। 'পদ্মাবতী' কাব্যে বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ তাঁর সঙ্গীতজ্ঞতার প্রমাণ দেয়। যে প্রমাণে উঠে আসে-
•কাব্যরীতি, ছন্দ ও অলঙ্কার।আলাওলের কাব্যরীতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো পাণ্ডিত্যপূর্ণ অলঙ্কারপ্রয়োগ ও গঠনশৈলীর প্রৌঢ়তা। তিনি পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের ব্যবহারে অসাধারণ নিপুণতা দেখিয়েছেন। তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের সুপ্রযুক্ত ব্যবহারে বাংলা কাব্যভাষাকে তিনি একটি প্রৌঢ় ও পরিমার্জিত রূপ দান করেছিলেন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,সৈয়দ আলাওল মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যকে ধর্মাশ্রয়ী গণ্ডি থেকে মুক্ত করে লৌকিক প্রেম, পাণ্ডিত্য ও সার্বজনীন মানবিক রসের ধারায় সমৃদ্ধ করেছিলেন। হিন্দি ও ফার্সি সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এনে তিনি যে সাংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment