Skip to main content

 ১. মঙ্গলকাব্য: সংজ্ঞা, শ্রেণিবিভাগ ও কবি তালিকা

মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যেসমস্ত সুরসংযোগে গীত কাব্য বিশেষ কোনো লৌকিক ও পৌরাণিক দেব-দেবীর মহিমা প্রচার, তাঁদের পূজা প্রতিষ্ঠা এবং ব্রতকথাকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট পরিকাঠামোয় রচিত হতো, সেগুলিকে মঙ্গলকাব্য বলা হয়। এগুলি মূলত পঞ্চালী ছন্দে রচিত এবং দেবপূজায় গীত হতো।

মঙ্গলকাব্যের শ্রেণিবিভাগ

মঙ্গলকাব্যকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: প্রধান মঙ্গলকাব্য ও অপ্রধান মঙ্গলকাব্য।

                  মঙ্গলকাব্য

                      │

       ┌──────────────┴──────────────┐

       ▼ ▼

প্রধান মঙ্গলকাব্য অপ্রধান মঙ্গলকাব্য

 ├── মনসামঙ্গল ├── ধর্মমঙ্গল

 ├── চণ্ডীমঙ্গল ├── শীতলামঙ্গল

 └── অন্নদামঙ্গল ├── সারদামঙ্গল

                              └── রায়মঙ্গল / অন্যান্য


১. প্রধান মঙ্গলকাব্য

যে কাব্যগুলি সমগ্র বাংলায় ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছিল, উচ্চ সাহিত্যগুণ সম্পন্ন এবং যাদের কাহিনি ও দেবমাহাত্ম্য বাঙালি সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেগুলি প্রধান মঙ্গলকাব্য।

 * মনসামঙ্গল: সর্পদেবী মনসার পূজা প্রচার এবং চাঁদ সওদাগরের শিবভক্তি বনাম মনসা-বিরোধিতার সংঘাত এই কাব্যের মূল ভিত্তি। বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি এর প্রধান আকর্ষণ। (প্রধান কবি: বিজয়গুপ্ত, বিপ্ৰদাস পিপিলাই, কেতকাদাস খেমানন্দ)।

 * চণ্ডীমঙ্গল: লৌকিক চণ্ডীদেবীকে পৌরাণিক চণ্ডীর রূপ দিয়ে মর্ত্যে তাঁর পূজা প্রতিষ্ঠার আখ্যান। এই কাব্য দুটি খণ্ডে বিভক্ত—আখেটিক খণ্ড (কালকেতু-ফুল্লরা) এবং বণিক খণ্ড (ধনপতি-শ্রীমন্ত)। (প্রধান কবি: মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)।

 * অন্নদামঙ্গল: অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত মঙ্গলকাব্যের শেষ শ্রেষ্ঠ ধারা। দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য এবং ভবানন্দ মজুমদার ও হরিহোড়ের আখ্যান এতে वर्णित। (প্রধান কবি: ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)।

২. অপ্রধান মঙ্গলকাব্য

যে কাব্যগুলি আঞ্চলিক বা নির্দিষ্ট লোকসমাজের মধ্যেই বেশি জনপ্রিয় ছিল এবং যাদের সাহিত্যিক প্রসার কিছুটা সীমিত ছিল, সেগুলিকে অপ্রধান মঙ্গলকাব্য বলা হয়।

 * ধর্মমঙ্গল: রাঢ় অঞ্চলের লৌকিক দেবতা 'ধর্মঠাকুর'-এর মাহাত্ম্য নিয়ে রচিত। এতে লাউসেনের বীরত্বগাথা ও অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা মেলে। (কবি: ময়ূর ভট্ট, ঘনরাম চক্রবর্তী, রূপরাম চক্রবর্তী)।

 * শীতলামঙ্গল: বসন্ত রোগের দেবী শীতলার মাহাত্ম্য ও কোপ থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে রচিত। (কবি: দ্বিজ হরিরাম, বলরাম দাস)।

 * সারদামঙ্গল: বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর মহিমা জ্ঞাপক কাব্য। (কবি: দিনদয়াল দাস)।

 * রায়মঙ্গল: সুন্দরবন অঞ্চলের ব্যাঘ্রদেবতা দক্ষিণরায়ের মহিমা ও বাঘের হাত থেকে রক্ষার ব্রতকথা নিয়ে রচিত। (কবি: কৃষ্ণরাম দাস)।

 * অন্যান্য: শিবায়ন (বা শিবমঙ্গল), ষষ্ঠীমঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল, সারদামঙ্গল ইত্যাদি।

চৈতন্যপূর্ব ও চৈতন্যপরবর্তী যুগের মঙ্গলকবিদের তালিকা

| সময়কাল | মঙ্গলকাব্যের ধারা | বিখ্যাত মঙ্গলকবিগণ | রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্য |

|---|---|---|---|

| চৈতন্যপূর্ব যুগ | মনসামঙ্গল | কানা হরিদত্ত | পদ্মপুরাণ / মনসামঙ্গল |

| | | বিজয়গুপ্ত | পদ্মপুরাণ |

| | | বিপ্ৰদাস পিপিলাই | মনসাবিজয় |

| | চণ্ডীমঙ্গল | মানিক দত্ত | চণ্ডীমঙ্গল |

| | ধর্মমঙ্গল | ময়ূর ভট্ট | ধর্মমঙ্গল (আদিকবি) |

| চৈতন্যপরবর্তী যুগ | মনসামঙ্গল | বংশীদাস | মনসামঙ্গল |

| | | কেতকাদাস খেমানন্দ | মনসামঙ্গল |

| | চণ্ডীমঙ্গল | দ্বিজ মাধব | সারদামঙ্গল / চণ্ডীমঙ্গল |

| | | মুকুন্দরাম চক্রবর্তী | কবিকঙ্কণ চণ্ডী / অভয়ামঙ্গল |

| | ধর্মমঙ্গল | রূপরাম চক্রবর্তী | ধর্মমঙ্গল |

| | | ঘনরাম চক্রবর্তী | শ্রীধর্মসংগীত |

| | অন্নদামঙ্গল | ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর | অন্নদামঙ্গল |

| | অন্যান্য | কৃষ্ণরাম দাস | রায়মঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল |

২. মনসামঙ্গলকাব্যের কাহিনি এবং আর্য-অনার্য সংঘাত ও সমন্বয়

     •মনসামঙ্গলকাব্যের সংক্ষেপিত কাহিনি মূলত দুটি খণ্ডে বিভক্ত—স্বর্গখণ্ড এবং মর্ত্যখণ্ড।

     •স্বর্গখণ্ডঃশিবের বীর্য থেকে পদ্মপত্রে মনসার জন্ম। স্বর্গ থেকে অভিশাপগ্রস্ত হয়ে মর্ত্যে আসেন অনিরুদ্ধ ও ঊষা, যারা মর্ত্যে লখিন্দর ও বেহুলা রূপে জন্মগ্রহণ করেন।

     •মর্ত্যখণ্ড ও মূল সংঘাতঃশিবভক্ত চম্পক নগরের ধনপতি ব্যবসায়ী চাঁদ সওদাগর কিছুতেই সর্পদেবী মনসাকে পূজা করতে রাজি নন। কারণ মনসা লৌকিক দেবী, আর চাঁদ পৌরাণিক দেব মহাদেবের ভক্ত।তবে-

        পূজা না পেয়ে ক্রুদ্ধ মনসা চাঁদের সপ্তডিঙা মধুকর সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন এবং চাঁদের ছয় পুত্রকে বিষধর সর্প দ্বারা ধ্বংস করেন। তবুও চাঁদ অটল থাকেন।অতঃপর আমরা দেখি-

     বেহুলা-লখিন্দরের আখ্যান।চাঁদের সপ্তম পুত্র লখিন্দরের বিয়ের রাতে লৌহবাসর ঘরে মনসার পাঠানো কালনাগিনী তাকে দংশন করে। সতীতেন্তে বলীয়ান বেহুলা ভেলায় চড়ে ভেসে যান এবং দেবপুরে পৌঁছে নাচ-গানে তুষ্ট করে দেবগণের কাছ থেকে লখিন্দরসহ ছয় ভাইয়ের প্রাণ ফিরিয়ে আনেন।অবশেষে 

       • বেহুলার অনুরোধে এবং দেবগণের আদেশে চাঁদ সওদাগর অবশেষে বাঁ হাতে মনসাকে একটি পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করেন। এর মাধ্যমে মর্ত্যে দেবী মনসার পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আর্য-অনার্য সংঘাত ও সমন্বয়ের চিত্রঃ মনসামঙ্গল কাব্য কেবল একটি পৌরাণিক বা অলৌকিক দেবকাহিনি নয়; এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, ধর্মীয় এবং নৃতাত্ত্বিক রূপান্তরের এক মহান দলিল।আর সেই দলিলে দেখি-

   সামাজিক ও ধর্মীয় পটভূমি। যে পটভূমিতে আছে-আর্য সংস্কৃতি। আসলে শিব ছিলেন বৈদিক ও পৌরাণিক ধারার আর্য সংস্কৃতির প্রতীক। সমাজের উচ্চবর্ণ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং সমৃদ্ধ বণিকশ্রেণি শিবের পূজারি ছিল।এরই পাশাপাশি ওঠে আসে-

     অনার্য সংস্কৃতি। দেবী মনসা ছিলেন লৌকিক, দ্রাবিড়/অনার্য জনজাতির সর্পদেবী। নিম্নেবর্ণের বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী (যেমন হাড়ি, ডোম, জেলে) দ্বারা তিনি পূজিতা হতেন।যেখানে সংঘাতের স্বরূপ হলো-

        আভিজাত্য বনাম লৌকিকতা।চাঁদ সওদাগর আর্য পুরুষতন্ত্র ও আভিজাত্যের প্রতীক। তিনি লৌকিক দেবী মনসাকে "কানা চোখা পদ্মা" বলে অবজ্ঞা করেছেন।তবুও চলতে থাকে- শক্তির লড়াই।মনসা তাঁর অস্তিত্ব ও পূজা প্রতিষ্ঠার জন্য একের পর এক অত্যাচার চালান—চাঁদের সুন্দর কানন ধ্বংস, পুত্রদের হত্যা, ডিঙা নিমজ্জনের মতো নৃশংস পথ বেছে নেন। অন্যদিকে চাঁদ শত বিপদেও হেইটাল লাঠি হাতে মনসার বিরুদ্ধে নিজের পুরুষকার ও আত্মমর্যাদা টিকিয়ে রাখার লড়াই করেন।আসলে-

       এই কাব্যে কেবল আর্য বা অনার্য কোনো এক পক্ষের একক জয় হয়নি। মনসা বুঝতে পেরেছিলেন, চাঁদের মতো বীর ও নিষ্ঠাবান শিবভক্তের পূজা না পেলে উচ্চসমাজে তাঁর দেবীত্ব স্বীকৃতি পাবে না।তবুও  চাঁদ সওদাগর শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মনসাকে পূজা দিতে সম্মত হন, তবে তা দেন বামহাতে এবং মনসার দিকে না তাকিয়ে। এটি ছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক আপস বা 'কম্প্রোমাইজ'।তবে-

      এই সংঘাত ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে অনার্য লোকদেবী মনসা আর্য দেবমণ্ডলীতে স্থান পান। এটি প্রমাণ করে কীভাবে মধ্যযুগের বাংলায় স্থানীয় লৌকিক বিশ্বাসগুলি ধীরে ধীরে মূলধারার পৌরাণিক হিন্দুধর্মের সাথে মিশে গিয়ে এক মিশ্র ও সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল।

৩. কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ও তাঁর ‘চণ্ডীমঙ্গল’

কবির কাব্য পরিচিতি

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের চণ্ডীমঙ্গল ধারার শ্রেষ্ঠ কবি হলেন কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত তাঁর কাব্যটি সাধারণ্যে 'চণ্ডীমঙ্গল' এবং কবির ভাষায় 'অভয়ামঙ্গল' বা 'অম্বিকামঙ্গল' নামে পরিচিত।

                  মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল

                            │

            ┌───────────────┴───────────────┐

            ▼ ▼

       আখেটিক খণ্ড বণিক খণ্ড

 (কালকেতু ও ফুল্লরার আখ্যান) (ধনপতি ও শ্রীমন্তের আখ্যান)


কাব্যের গঠন ও কাহিনি সংক্ষেপ:

 * আখেটিক খণ্ড: নীলাম্বর ও ছায়ার মর্ত্যে জন্ম (কালকেতু ও ফুল্লরা)। কালকেতু ব্যাধের দারিদ্র্য, চণ্ডীর কৃপায় ধনলাভ, গুজরাট নগর পত্তন এবং রাজা হয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত কাহিনি এতে বর্ণিত।

 * বণিক খণ্ড: ধনপতি সওদাগর, তাঁর দুই স্ত্রী লহনা ও খুল্লনা এবং পুত্র শ্রীমন্তের সিংহল যাত্রা ও চণ্ডীর কৃপায় বিপদমুক্তির গল্প।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুকুন্দরামের গুরুত্ব

মুকুন্দরাম মধ্যযুগের কবি হয়েও তাঁর চিন্তা ও শিল্পরীতিতে ছিলেন আধুনিক আধুনিকতার পথিকৃৎ।

১. বাস্তবসম্মত সমাজচিত্র ও যুগের দলিল

মধ্যযুগের অধিকাংশ কবিই স্বর্গ ও দেবলোক নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু মুকুন্দরাম তাঁর কাব্যে ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার সমাজ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডিহিদার মামুদ শরিফের অত্যাচার, কর-পীড়ন এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের নিখুঁত দলিল তুলে ধরেছেন।

> "প্রজা পালায় প্রজা পালায়..." — ডিহিদারের অত্যাচারে প্রজা উচ্ছেদ ও ভিটেমাটি ছাড়ার যে বাস্তব ছবি তিনি এঁকেছেন, তা তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে বিরল।

২. জীবনমুখী ও বাস্তব চরিত্র সৃষ্টি

মুকুন্দরাম চরিত্র চিত্রণে অসাধারণ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। দেবদেবী অপেক্ষা মানুষের চরিত্রগুলি তাঁর হাতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে:

 * কালকেতু-ফুল্লরা: সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি। ফুল্লরার 'বারমাসী'-তে বাঙালি নারীর দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্ট ফুট উঠেছে।

 * ভাঁড়ু দত্ত ও মুরারী শীল: মধ্যযুগের শঠ, প্রতারক ও স্বার্থপর মানুষের চিরাচরিত চরিত্রায়ন।

 * লহনা ও খুল্লনা: সতীনের ইর্ষা ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের খাঁটি চিত্র।

৩. রসবোধ ও হাস্যরস

মুকুন্দরামের কাব্যে করুণ রসের পাশাপাশি সূক্ষ্ম হাস্যরস ও ব্যঙ্গাত্মক রস দেখা যায়। দেব-দেবীর অলৌকিকতাকে তিনি বাঙালির সাধারণ গৃহস্থালি জীবনের হাস্যরসে রূপান্তরিত করেছেন।

৪. উপন্যাসের পূর্বসূরি (বাস্তববাদিতা)

বিশিষ্ট সমালোচক ই. বি. ক্লেওয়েল বা ক্ষেত্রগুপ্ত মুকুন্দরামকে "বাংলা উপন্যাসের জনক" বা "মধ্যযুগের বঙ্কিমচন্দ্র" বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর কাব্যের চরিত্রায়ন, সামাজিক নাটকীয়তা এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা আধুনিক উপন্যাসের লক্ষণ বহন করে।

৫. আধুনিক কাব্যরীতি ও ভাষার সহজতা

পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের সাবলীল ব্যবহার এবং কথ্য বাংলা শব্দের প্রয়োগে মুকুন্দরাম কাব্যকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন। কৃত্রিম অলংকারের চেয়ে তিনি লোকজীবনের ভাষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যযুগের দেবকেন্দ্রিক ভাবালুতার যুগে দাঁড়িয়ে মুকুন্দরাম মানবকেন্দ্রিক সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি স্বর্গ থেকে সাহিত্যকে মর্ত্যের মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন। তাই মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী কেবল একজন মঙ্গলকাব্য রচয়িতা নন, তিনি ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ সমাজচিত্রকর ও মানবতাবাদী কবি।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...