অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন।।"ব্রহ্ম সত্যং জগৎ মিথ্যা, জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ"-উক্তিটির তাৎপর্য সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।
আচার্য শংকর রচিত অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের মূল সিদ্ধান্ত এবং দার্শনিক নির্যাসকে একটিমাত্র বাক্যে প্রকাশ করা হয়েছে-"ব্রহ্ম সত্যং জগৎ মিথ্যা, জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ"। শংকরাচার্যের মতে, পরমার্থত এক ও অদ্বিতীয় 'ব্রহ্ম' ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বস্তুর অস্তিত্ব নেই। এই শ্লোকার্ধটিকে তিনটি প্রধান ভাগে বিশ্লেষণ করা যায়। আর সেই বিশ্লেষণে আমরা পাই-
১) ব্রহ্ম সত্যং (ব্রহ্মই পরম সত্য): অদ্বৈত বেদান্তে 'সত্য' বলতে তাকেই বোঝায়, যা 'ত্রিকাল অবাধিত'—অর্থাৎ যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-এই তিন কালেই অপরিবর্তিত থাকে এবং যা অন্য কোনো জ্ঞান দ্বারা বাধিত (contradicted) হয় না।যার স্বরূপ-
একমাত্র পরমব্রহ্মই অবিনাশী, নিত্য, চৈতন্যময় ও সৎ-চিত-আনন্দস্বরূপ। তাই একমাত্র ব্রহ্মই 'পারমার্থিক সত্য'।
২)জগৎ মিথ্যা (জগতের অনির্বচনীয়তা): অদ্বৈত বেদান্তে 'মিথ্যা' শব্দটির অর্থ তুচ্ছ বা সম্পূর্ণ অসৎ (যেমন-আকাশকুসুম বা খরগোশের শিং) নয়। শংকরাচার্যের মতে, জগৎ হলো 'অনির্বচনীয়' বা 'সদসদ্বিলক্ষণ' (যা সৎ-ও নয়, আবার অসৎ-ও নয়)।যার ব্যবহারিক সত্তা হলো-
ব্রহ্মজ্ঞান লাভ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বজগৎ আমাদের কাছে সৎ বা বাস্তব মনে হয়, একে বলা হয় 'ব্যবহারিক সত্তা'। কিন্তু মায়া বা অবিদ্যার নাশ ঘটে যখন ব্রহ্মজ্ঞান অর্জিত হয়, তখন জগতের নাম-রূপাতীত প্রপঞ্চ মিথ্যা বা বাধিত বলে প্রমাণিত হয়।
৩) জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ (জীব ও ব্রহ্মের অভিন্নতা): অবিদ্যা বা অজ্ঞানের কারণে জীব নিজেকে দেহ, মন ও অহংকারের সাথে যুক্ত ভেবে পরমাত্মা বা ব্রহ্ম থেকে পৃথক বলে মনে করে। আর সেখানে উপাধির বিনাশ হয়-
অদ্বৈতমতে, যেমন ঘটে আবৃত আকাশ (ঘটাকাশ) ও উন্মুক্ত মহাকাশ মূলত একই আকাশ, তেমনই উপাধিযুক্ত (দেহ-মন-বুদ্ধি দ্বারা সীমাবদ্ধ) ব্রহ্মই হলো 'জীব'।আসলে-
শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের মাধ্যমে যখন অবিদ্যা দূর হয়, তখন জীব উপলব্ধি করে-'অহং ব্রহ্মাস্মি' (আমিই ব্রহ্ম)। জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে বস্তুত কোনো ভেদ বা পার্থক্য নেই।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে রজ্জুতে যেমন অজ্ঞানের কারণে সর্পভ্রম ঘটে, তেমনই একমাত্র পরমব্রহ্মেই অবিদ্যার প্রভাবে এই নাম-রূপাত্মক জগতের অধ্যাস বা বিভ্রান্তি ঘটে। প্রকৃত আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হলে মায়ার আবরণ ছিন্ন হয় এবং অদ্বিতীয় ব্রহ্মসত্তা প্রকাশিত হয়।
Comments
Post a Comment