Skip to main content

দলীয় ব্যবস্থা টীকা।।

দলীয় ব্যবস্থা টীকা।। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় সপ্তম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর।



প্রশ্ন: ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’-র পতনের কারণসমূহ (সংক্ষিপ্ত টীকা)

(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ নম্বরের উপযোগী উত্তর)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজনী কোঠারি বর্ণিত ১৯৫২-১৯৬৭ সালের ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’ (Congress System) বা এক-দলীয় আধিপত্যের রাজনীতি ১৯৬৭ পরবর্তী সময়ে ধাক্কা খায় এবং ১৯৭৭ সালের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচনে এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত পতন ঘটে। কংগ্রেস ব্যবস্থার পতনের প্রধান কারণগুলি নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

 * নেহেরুর তিরোধান ও নেতৃত্ব সংকট: ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর কংগ্রেস দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা ও বিভিন্ন উপদলের (Factions) মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ঐতিহ্যটি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দলীয় ঐক্য নষ্ট করে।

 * ১৯৬৭ সালের নির্বাচন ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: ১৯৬৭ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্রে কোনোমতে সরকার গড়লেও পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশসহ ৮টি রাজ্যে পরাজিত হয়। অ-কংগ্রেসি দলগুলির এই উত্থান কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে দেয়।

 * দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন (১৯৬৯): ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং দলের প্রবীণ নেতাদের ‘সিন্ডিকেট’ গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এর ফলে দলীয় ভাঙন (Congress-O এবং Congress-R) ঘটে এবং কোঠারি বর্ণিত ‘সম্মতির রাজনীতি’ বিনষ্ট হয়।

 * ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ: সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক দরকষাকষির কাঠামো ভেঙে দিয়ে ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ ঘটান। এর ফলে রাজ্য স্তরের নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দলের ‘ছাতা সংগঠন’ (Catch-all platform) রূপটি নষ্ট হয়।

 * অর্থনৈতিক সংকট ও গণ-অসন্তোষ: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে দেশে খাদ্যসংকট, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং যুদ্ধের অভিঘাতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়, যা কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

 * বিরোধী ঐক্য ও জেপি আন্দোলন: ১৯৭০-এর দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণের (JP) নেতৃত্বে ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ আন্দোলন এবং বিভিন্ন বিরোধী দলের (সমাজবাদী, জনসংঘ ও আঞ্চলিক শক্তি) ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টির সরকারের উত্থান ঘটায় এবং ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’-র আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।


প্রশ্ন: ভারতের রাজনীতিতে দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) (সংক্ষিপ্ত টীকা)

(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ নম্বরের উপযোগী উত্তর)

স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও মন্ত্রী পদের লোভে অনবরত দলবদলের (যেটি রাজনীতিতে ‘আয়া রাম, গয়া রাম’ সংস্কৃতি নামে পরিচিত ছিল) ফলে নির্বাচিত সরকারগুলির স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়ে। এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করতে ১৯৮৫ সালে ৫২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের ১০ম তফসিলে (Tenth Schedule) ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’ যুক্ত করা হয়।

দলত্যাগ বিরোধী আইনের মূল বিধানসমূহ

১. স্বচ্ছাসেবায় দলত্যাগ: কোনো রাজনৈতিক দলের টিকিটে নির্বাচিত সদস্য যদি স্বেচ্ছায় সেই দলের সদস্যপদ ত্যাগ করেন, তবে তাঁর সংসদ বা বিধানসভার সদস্যপদ বাতিল হয়।

২. দলীয় নির্দেশ (Whip) অমান্য: দলীয় নির্দেশের (Whip) বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিলে বা ভোটদানে বিরত থাকলে সদস্যপদ খারিজ হতে পারে।

৩. নির্দল ও মনোনীত সদস্য: কোনো নির্দল প্রার্থী জয়ের পর কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিলে এবং মনোনীত সদস্য ৬ মাস পর কোনো দলে যোগ দিলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হয়।

৪. ব্যতিক্রম: মূল আইনের এক-তৃতীয়াংশ এবং ২০০৩ সালের ৯১তম সংবিধান সংশোধনীর পর দলের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্য একসঙ্গে অন্য দলে যোগ দিলে তা আইনি ‘একত্রীকরণ’ (Merge) হিসেবে গণ্য হয় এবং সদস্যপদ বাতিল হয় না।

আইনের ভূমিকা ও ইতিবাচক দিক

 * সরকারের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি: অনৈতিক দলবদল রুখে এটি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির রাজনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছে।

 * দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা: দলীয় হুইপ ও শৃঙ্খলার বাধ্যবাধকতা দলীয় কাঠামোক মজবুত করেছে।

 * জনমতের সম্মান: যে দলের প্রতীকে প্রার্থী জিতেছেন, সেই দলের প্রতি ভোটারের রায়কে সুরক্ষা দেয়।

সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক

 * স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: আইন অনুযায়ী দলত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন লোকসভা বা বিধানসভার স্পিকার। কিন্তু স্পিকারের দলীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রায়শই বিতর্ক তৈরি হয়।

 * সদস্যদের বাক-স্বাধীনতা খর্ব: দলীয় নির্দেশের বাইরে গিয়ে সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ কমে গেছে।

 * গণ-দলত্যাগে ছাড়: ২/৩ অংশ সদস্যের গণ-দলবদল বৈধ হওয়ায় বড় মাপের ক্রয়-বিক্রয় বা দল ভাঙানোর রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি (যেমন সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজ্যের অভিজ্ঞতা)।

মূল্যায়ন

ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও ভারতীয় গণতন্ত্রে অস্থিতিশীলতা রোধ করতে এবং রাজনৈতিক নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে এই আইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।


প্রশ্ন: ভারতে জোট রাজনীতির প্রভাব ও তাৎপর্য (সংক্ষিপ্ত টীকা)

(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ নম্বরের উপযোগী উত্তর)

স্বাধীন ভারতের দলীয় রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক মোড়। এক-দলীয় আধিপত্য ও ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’-র অবসানের পর জাতীয় স্তরে জোট রাজনীতি (Coalition Politics)-র যুগের সূচনা ঘটে। ১৯৯০-এর দশক থেকে পরবর্তী প্রায় আড়াই দশক ধরে জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (NDA) এবং সমন্বিত প্রগতিশীল মোর্চা (UPA)-র মতো বড় জোট সরকারগুলি ভারত শাসন করেছে।

জোট রাজনীতির প্রধান তাৎপর্য ও প্রভাব

 * কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও যুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুসংহতকরণ:

   জোট রাজনীতির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য বৃদ্ধি। জাতীয় দলগুলি এককভাবে ক্ষমতায় আসতে না পারায় রাজ্যভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলির রাজনৈতিক গুরুত্ব ও দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ভারতীয় যুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো (Federalism) আরও শক্তিশালী ও বাস্তবিক রূপ পায়।

 * বহুত্ববাদী সমাজের প্রতিনিধিত্ব:

   ভারত একটি বহু-জাতি, বহু-ভাষিক ও বহু-সাংস্কৃতিক দেশ। জোট সরকারে বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট ও আঞ্চলিক দলগুলির অংশগ্রহণের ফলে জাতীয় স্তরের নীতি নির্ধারণে দেশের সমস্ত প্রান্ত ও বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠীর মতামত প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

 * স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা:

   একক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় জোট সরকারগুলি কোনো চরম বা স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত সহজে চাপিয়ে দিতে পারে না। নীতির যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জোটসঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা (Consensus) করতে হয়, যা গণতান্ত্রিক দরকষাকষিকে উৎসাহিত করে।

জোট রাজনীতির নেতিবাচক দিক বা সীমাবদ্ধতা

 * রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা:

   ১৯৯০-এর দশকে ক্ষণে ক্ষণে জোটসঙ্গীদের সমর্থন প্রত্যাহারের কারণে দেবা গৌড়া বা আই. কে. গুজরালের সরকার স্বল্পমেয়াদী প্রমাণিত হয়েছিল, যা দেশের অর্থনৈতিক ও নীতিগত স্থায়িত্বকে বিঘ্নিত করেছিল।

 * ‘ব্ল্যাকমেলিং’ ও দুর্বল কেন্দ্র:

   অনেক সময় ছোট আঞ্চলিক দলগুলি নিজের স্বার্থসিদ্ধি বা সংকীর্ণ এজেন্ডা পূরণের জন্য জাতীয় মূলনীতির (যেমন—বিদেশনীতি বা জাতীয় নিরাপত্তা) ক্ষেত্রেও মূল শাসক দলকে রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলে দিত।

মূল্যায়ন

পরিশেষে বলা যায়, ২০১৪ পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসা সত্ত্বেও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা আজও জোটমুক্ত নয় (যেমন—NDA ও বিরোধী 'INDIA' জোট)। ভারতে জোট রাজনীতি কেবল একটি শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, এটি ভারতীয় সমাজের বহুত্ববাদ ও বিকেন্দ্রীভূত গণতন্ত্রের অন্যতম বাস্তব প্রতিফলন।


প্রশ্ন: ভারতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের উত্থানের কারণ (সংক্ষিপ্ত টীকা)

(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ নম্বরের উপযোগী উত্তর)

স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাজনীতিতে প্রধানত জাতীয় দলগুলির প্রাধান্য থাকলেও, বিশেষ করে ১৯৬৭ সালের পর থেকে এবং ১৯৮৯ পরবর্তী জোট রাজনীতির যুগে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলির (Regional Political Parties) অভূতপূর্ব উত্থান ঘটে। তামিলনাড়ুর DMK, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস, বিহারের RJD বা অন্ধ্রপ্রদেশের TDP-র মতো দলগুলি ভারতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

আঞ্চলিক দলের উত্থানের মূল কারণসমূহ

 * আঞ্চলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্য:

   ভারত একটি বহু-জাতি, বহু-ভাষিক ও বহু-সাংস্কৃতিক দেশ। জাতীয় দলগুলি ভারতের সমস্ত অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যকে সমান গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আঞ্চলিক স্তরে নিজস্ব অস্মিতা ও পরিচয় রক্ষার প্রয়োজনে আঞ্চলিক দলের জন্ম হয়।

 * কেন্দ্রের অতি-কেন্দ্রীকরণ ও জাতীয় দলগুলির ব্যর্থতা:

   কংগ্রেসের এক-দলীয় আধিপত্যের যুগে কেন্দ্রের চরম ক্ষমতা প্রয়োগ এবং রাজ্যগুলির প্রতি অবহেলা আঞ্চলিক অসন্তোষের জন্ম দেয়। তাছাড়া, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও স্থানীয় অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে জাতীয় দলগুলির ব্যর্থতা আঞ্চলিক শক্তিগুলিকে শক্তিশালী করে।

 * জাতীয় স্তরে একক দলের আধিপত্য হ্রাস:

   ১৯৮৯ সালের পর জাতীয় স্তরে কংগ্রেস ব্যবস্থার পতন ঘটলে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই সময় কেন্দ্রের দুর্বলতার সুযোগে আঞ্চলিক দলগুলি জাতীয় রাজনীতিতে দরকষাকষির প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।

 * কৃষক ও মধ্যবর্তী জাতির (Intermediate Castes) রাজনৈতিক সচেতনতা:

   সবুজ বিপ্লবের পর গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন এক ধনী ও মাঝারি কৃষক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। এই সামাজিক গোষ্ঠীগুলি জাতীয় দলগুলির উচ্চবর্ণ কেন্দ্রিক রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজস্ব আঞ্চলিক দল (যেমন—বিহারে RJD, উত্তরপ্রদেশে SP) গড়ে তোলে।

 * রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের দাবি:

   রাজ্যগুলির জন্য অধিক অর্থ ও স্বায়ত্তশাসনের (Autonomy) দাবি এবং কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের (যেমন—৩৫৬ ধারা প্রয়োগ) বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য স্থানীয় আঞ্চলিক দলগুলির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

মূল্যায়ন

আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান ভারতের রাজনীতিকে কেবল বিকেন্দ্রীভূত করেনি, বরং ভারতীয় যুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে (Federalism) প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতামূলক ও গণতান্ত্রিক রূপ দিয়েছে। জাতীয় নীতি নির্ধারণে রাজ্যগুলির স্বার্থ তুলে ধরতে এই দলগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য।


প্রশ্ন: ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’-র পতনের কারণসমূহ (সংক্ষিপ্ত টীকা)

(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ নম্বরের উপযোগী উত্তর)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজনী কোঠারি বর্ণিত ১৯৫২-১৯৬৭ সালের ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’ (Congress System) বা এক-দলীয় আধিপত্যের রাজনীতি ১৯৬৭ পরবর্তী সময়ে সংঘাতের মুখোমুখি হয় এবং ১৯৭৭ সালের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচনে এই ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। কংগ্রেস ব্যবস্থার পতনের প্রধান কারণগুলি হলো:

 * নেহেরুর তিরোধান ও ভারসাম্য বিনাশ: ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বিভিন্ন উপদলের (Factions) মধ্যে সমঝোতা ও ভারসাম্য রক্ষার ঐতিহ্যটি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দলের ভেতরের শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে।

 * ১৯৬৭ সালের রাজনৈতিক রূপান্তর: ১৯৬৭ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্রে কোনোমতে ক্ষমতায় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশসহ ৮টি রাজ্যে পরাজিত হয়। অ-কংগ্রেসি সংযুক্ত বিধায়ক দল (SVD) সরকারগুলির উত্থান কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্যে প্রথম বড় আঘাত হানে।

 * দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন (১৯৬৯): ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং দলের প্রবীণ ‘সিন্ডিকেট’ নেতাদের সংঘাতের ফলে দল দ্বিধাবিভক্ত (Congress-O এবং Congress-R) হয়ে যায়। এর ফলে সর্বজনগ্রাহ্য ‘সম্মতির রাজনীতি’ (Politics of Consensus) ভেঙে পড়ে।

 * ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়: সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলেন। ফলে রাজ্য স্তরের নেতৃত্ব ক্ষমতা হারায় এবং কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী ‘ছাতা সংগঠন’ (Catch-all platform) রূপটি নষ্ট হয়।

 * অর্থনৈতিক সংকট ও জনরোষ: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে খাদ্যসংকট, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি এবং পর পর দুটি যুদ্ধের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়, যা কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।

 * বিরোধী ঐক্য ও জেপি আন্দোলন: ১৯৭০-এর দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণের (JP) ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ আন্দোলন এবং বিভিন্ন বিরোধী শক্তির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টির সরকারের জন্ম দেয়, যা ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’-র চূড়ান্ত পতন ঘটায়।






Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...