Skip to main content

রজনী কোঠারিকে অনুসরণ করে ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’ (Congress System) ধারণাটি ব্যাখ্যা করো। এই ব্যবস্থার পতনের কারণগুলি কী ছিল? পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সপ্তম সেমিস্টার ইউনিট ১।




প্রশ্ন: রজনী কোঠারির ‘কংগ্রেস ব্যবস্থা’ (Congress System) তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করো। এই ব্যবস্থার পতনের কারণগুলি আলোচনা করো।

(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.এ. রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্স/সাধারণ পাঠ্যক্রমের ১২ নম্বরের উপযোগী আদর্শ উত্তর)

ভূমিকা

স্বাধীনতার পরবর্তী দুই দশক ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে জাতীয় কংগ্রেস দলের একক ও অপ্রতিহত প্রভাব দেখা গিয়েছিল। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ভারতের এই অনন্য রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বিশিষ্ট ভারতীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজনী কোঠারি (Rajni Kothari) ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রকাশিত বিখ্যাত নিবন্ধে "কংগ্রেস ব্যবস্থা" (Congress System) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, এটি সাধারণ এক-দলীয় আধিপত্য নয়, বরং ভারতের বহুত্ববাদী সমাজের সাথে মানানসই একটি স্বকীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো।

রজনী কোঠারি বর্ণিত 'কংগ্রেস ব্যবস্থা'-র মূল বৈশিষ্ট্য

রজনী কোঠারির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কংগ্রেস ব্যবস্থার মূল ভিত্তিগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

 * এক-দলীয় আধিপত্য ও বহুদলীয় কাঠামো (Dominance within a Multi-Party Setup):

   ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে বহুদলীয় ব্যবস্থা ও অবাধ নির্বাচন বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে কেন্দ্র ও অধিকাংশ রাজ্যে কংগ্রেস দল এককভাবে শাসনক্ষমতা ভোগ করত। বিরোধী দলগুলি অস্তিত্বশীল হলেও তারা ক্ষমতা দখলের অবস্থায় ছিল না।

 * ছাতা সংগঠন বা 'ক্যাচ-অল পার্টি' (Catch-all Party):

   কংগ্রেস কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণী বা গোষ্ঠীর দল ছিল না। এটি ছিল একটি সর্বসমেত প্ল্যাটফর্ম যেখানে দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী, মধ্যপন্থী, শিল্পপতি, কৃষক এবং সব ধর্মের মানুষ স্থান পেয়েছিল। এটি স্বাধীনতাসংগ্রামের ঐতিহ্য বহন করায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

 * সম্মতি ও দরকষাকষির রাজনীতি (Politics of Consensus):

   কংগ্রেস ব্যবস্থা পরিচালিত হতো সহমতের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলি সমাজ ও দলের ভেতরের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর সাথে দরকষাকষি ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে নেওয়া হতো।

 * অভ্যন্তরীণ দলাদলি ও উপদলীয় শৃঙ্খলা (Factionalism as Opposition):

   কোঠারির মতে, কংগ্রেস ব্যবস্থার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল দলের অভ্যন্তরীণ উপদল বা দলাদলি (Factions)। কংগ্রেসের ভেতরেই বিভিন্ন মতাদর্শের গোষ্ঠী ছিল। বিরোধী দলগুলি সরাসরি সরকারকে প্রভাবিত করার বদলে কংগ্রেসের ভেতরের সমমনোভাবাপন্ন উপদলকে প্রভাবিত করত। ফলে দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যই প্রকৃত বিরোধী দলের কাজ করত।

 * চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে বিরোধী দল (Opposition as Pressure Groups):

   এই ব্যবস্থায় বাইরের বিরোধী দলগুলি বিকল্প সরকার গঠনের সুযোগ পেত না, তবে তারা ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ (Pressure Groups) হিসেবে কাজ করত। কংগ্রেস দল নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে বিরোধী দলগুলির যৌক্তিক দাবি ও নীতিগুলিকে নিজের কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিত।

কংগ্রেস ব্যবস্থার পতনের কারণসমূহ

১৯৬৭ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে এই ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে এবং ১৯৭৭ সালে এর চূড়ান্ত পতন ঘটে। পতনের প্রধান কারণগুলি হলো:

 * ১৯৬৭ সালের নির্বাচন ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান:

   ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্রে কোনোক্রমে সরকার গড়লেও দেশের আটটি রাজ্যে পরাজিত হয়। বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক অ-কংগ্রেসি সংযুক্ত বিধায়ক দল (SVD) সরকার গঠিত হয়, যা কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে দেয়।

 * নেহেরুর তিরোধান ও রাজনৈতিক শুন্যতা:

   জওহরলাল নেহেরুর সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বের কারণে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ উপদলগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকত। ১৯৬৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দলের ভেতরের ঐতিহ্যবাহী সমঝোতার কাঠামোটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

 * দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন (১৯৬৯):

   ১৯৬৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও দলের প্রবীণ সিন্ডিকেট নেতাদের মধ্যে সংঘাতের ফলে কংগ্রেস দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় (Congress-O এবং Congress-R)। এর ফলে কোঠারি বর্ণিত ‘সম্মতির রাজনীতি’ বিনষ্ট হয়।

 * ইন্দিরা গান্ধীর অতি-কেন্দ্রিকতা ও প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়:

   ইন্দিরা গান্ধী দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক দরকষাকষির কাঠামো ভেঙে দিয়ে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। ফলে তৃণমূল স্তরের নেতাদের প্রভাব হ্রাস পায় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির সূচনা হয়।

 * অর্থনৈতিক সংকট ও গণ-অসন্তোষ:

   ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে খাদ্যসংকট, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ভারত-চীন ও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ধাক্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়, যা কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।

 * বিরোধী ঐক্য ও ১৯৭১-৭৫-এর আন্দোলন:

   জয়প্রকাশ নারায়ণের (JP) নেতৃত্বে 'সম্পূর্ণ বিপ্লব' আন্দোলন এবং অ-কংগ্রেসি দলগুলির (সমাজবাদী, জনসংঘ ও আঞ্চলিক দল) ঐক্যবদ্ধ অবস্থান কংগ্রেস ব্যবস্থাকে কোণঠাসা করে দেয়। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা এবং ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জনতা পার্টির কাছে কংগ্রেসের পরাজয় এই ব্যবস্থার সমাপ্তি চিহ্নিত করে।

মূল্যায়ন

পরিশেষে বলা যায়, রজনী কোঠারির 'কংগ্রেস ব্যবস্থা' স্বাধীন ভারতের প্রারম্ভিক রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষার বিকাশ এই ব্যবস্থার পতন ত্বরান্বিত করে। তা সত্ত্বেও, আধুনিক ভারতের জোট রাজনীতি ও দলীয় ব্যবস্থার বিবর্তন বুঝতে কোঠারির এই তত্ত্বটি আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...