অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন।। শঙ্করাচার্য স্বীকৃত 'তিন প্রকার সত্তা' (পারমার্থিক, ব্যবহারিক ও প্রাতিভাসিক সত্তা) বিস্তারিত আলোচনা করো।
অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন।। শঙ্করাচার্য স্বীকৃত 'তিন প্রকার সত্তা' (পারমার্থিক, ব্যবহারিক ও প্রাতিভাসিক সত্তা) বিস্তারিত আলোচনা করো।
অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে আচার্য শঙ্কর জগৎ ও ব্রহ্মের অবস্থান এবং অভিজ্ঞতার তারতম্য বোঝাতে 'সত্তাত্রৈবিধবাদ' বা তিন প্রকার সত্তার তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, সত্তা বা অস্তিত্ব বলতে এমন কিছুকে বোঝায় যা কোনোকালেই বাতিল বা বাধিত হয় না। এই বিচারে অদ্বৈত বেদান্তে অভিজ্ঞতার জগতকে প্রধানত তিনটি স্তরে বা সত্তায় ভাগ করা হয়েছে। আর সেই ভাগ গুলি হলো-
১) পারমার্থিক সত্তাঃ পারমার্থিক সত্তা একমাত্র পরম, ত্রিকাল অবাধিত ও পরিবর্তনহীন সত্য। যা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে-কখনোই বাতিল বা মিথ্যা প্রমাণিত হয় না, তা-ই পারমার্থিক সত্তা।সেকারণেই-
অদ্বৈত মতে একমাত্র 'নির্গুণ ব্রহ্ম' বা আত্মাই পারমার্থিক সত্তার অধিকারী।যা কোনো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার দ্বারা ব্রহ্মজ্ঞান বাধিত হতে পারে না। ব্রহ্মই একমাত্র সৎ, চিত ও আনন্দস্বরূপ পরম সত্য ("ব্রহ্ম সত্য")।
২)ব্যবহারিক সত্তাঃ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যে জগতকে আমরা সত্য বলে অভিজ্ঞতা করি, তা-ই ব্যবহারিক সত্তা। লোকব্যবহার, সমাজ, ধর্মকর্ম ও বৈজ্ঞানিক সত্য-সবই এই সত্তার অন্তর্গত।
আমাদের চারপাশে দৃশ্যমান জগৎ-গাছপালা, নদীনালা, মানুষ, ঈশ্বর (সগুণ ব্রহ্ম) এবং দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ।তবে-
যতক্ষণ না কোনো সাধক ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ব্যবহারিক জগত সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু পরম পারমার্থিক ব্রহ্মজ্ঞান অর্জিত হলে এই জগত মিথ্যা বা বাধিত হয়ে যায়। অর্থাৎ, পারমার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিত্য নয়, কিন্তু প্রাতিভাসিক ঘটনার মতো ক্ষণস্থায়ীও নয়।
৩)প্রাতিভাসিক সত্তাঃ অবিদ্যা বা ব্যক্তিগত ভ্রমের কারণে সাময়িকভাবে যে বস্তু বা বিষয়ের রূপ আমাদের সামনে প্রতিভাত বা মনে হয়, তাকে প্রাতিভাসিক সত্তা বলে।
অন্ধকারে দড়িতে সাপ দেখার ভ্রম (রজ্জুতে সর্পভ্রম), ঝিনুককে রূপো মনে করা, অথবা স্বপ্নের জগত। এই সত্তার স্থায়িত্ব খুবই অল্প। সাধারণ লৌকিক বা ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ হওয়ামাত্রই এই ভ্রান্তি কেটে যায়। যেমন-আলো ফেললেই জানা যায় যে সেটি সাপ নয়, দড়ি। অর্থাৎ, ব্যবহারিক জ্ঞানের দ্বারাই প্রাতিভাসিক সত্তা বাতিল বা বাধিত হয়।
•সত্তা তিনটির পারস্পরিক সম্বন্ধঃঅদ্বৈত বেদান্তে এই তিন সত্তার সম্বন্ধকে একটি বিশেষ ক্রমের মাধ্যমে বোঝানো যায়। যেখানে-
১. প্রাতিভাসিক সত্তা।সাধারণ ব্যবহারিক জ্ঞানের দ্বারা সাময়িক ভ্রম বা স্বপ্নের জগত।
২. ব্যবহারিক সত্তা। পরম ব্রহ্মজ্ঞানের (পারমার্থিক জ্ঞান) দ্বারা ব্রহ্মজ্ঞান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সত্য জগত |
৩. পারমার্থিক সত্তা।কোনো কিছুর দ্বারাই বাধিত হয় না ত্রিকাল অবাধিত পরম সত্য (ব্রহ্ম)।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,শঙ্কর এই তিন প্রকার সত্তার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, জগৎ পুরোপুরি অসৎ বা শূন্য নয় (কারণ ব্যবহারিক স্তরে এর কার্যকারিতা আছে), আবার পরম সত্যও নয়। আত্মাই একমাত্র পারমার্থিক সত্য, আর জগত হলো মায়াকৃত ব্যবহারিক সত্য মাত্র।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment