Skip to main content

 ১) টপ্পা গান রাগাশ্রী হলেও একে লোকগান হিসেবে বিচার করা হয়- এই উক্তিটির যাথার্থ্য বিচার করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা প্রথম সেমিস্টার মাইনর।

​ভূমিকা

​টপ্পা বাংলা সংগীত সাহিত্যের একটি অত্যন্ত বিশিষ্ট ও জনপ্রিয় ধারা। উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর নিয়মকানুন এবং লোকসংগীতের সহজিয়া আবেগ—এই দুয়ের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে টপ্পা গানে। টপ্পা উচ্চাঙ্গ রাগসঙ্গীতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও এর মেজাজ, পরিবেশনশৈলী এবং লৌকিক জীবনের সহজ-সরল অনুভূতির প্রকাশের কারণে একে লোকগানের অন্তর্ভুক্ত বা লোকসংগীতধর্মী হিসেবে বিচার করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। নিচে উক্তিটির যাথার্থ্য বিশদভাবে বিচার করা হলো।

​টপ্পা গানের শাস্ত্রীয় বা রাগভিত্তিক রূপ (রাগাশ্রী দিক)

​টপ্পাকে শাস্ত্রীয় সংগীতে 'অর্ধ-শাস্ত্রীয়' বা 'উপ-শাস্ত্রীয়' (Semi-classical) সংগীতের মর্যাদা দেওয়া হয়। এটি রাগাশ্রী হওয়ার মূল কারণগুলি হলো:

​রাগের ব্যবহার: টপ্পা গান নির্দিষ্ট রাগ ও তালের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মূলত খেয়াল বা ঠুমরি যে সমস্ত রাগে গাওয়া হয় (যেমন—ভৈরী, কাফী, খাম্বাজ, পিলু, দেশ ইত্যাদি), টপ্পাতেও সেগুলির ব্যবহার দেখা যায়।

​অলংকার ও তান: টপ্পার প্রধান অলংকার হলো 'দানাদার তান' বা দ্রুতগতির জটিল ক্ষিপ্র তানের প্রয়োগ। এর জন্য কণ্ঠের দীর্ঘ সাধনা ও কারুকাজের প্রয়োজন হয়, যা সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় সংগীতের বৈশিষ্ট্য।

​তালের নিয়মবদ্ধতা: টপ্পায় মূলত 'টপ্পা তাল' বা 'মধ্যমান' তাল ব্যবহৃত হয়। তালের এই নির্দিষ্ট কাঠামো এটিকে অনিয়ন্ত্রিত লোকসংগীত থেকে আলাদা করে এক প্রকার নিয়মাবদ্ধ রূপ প্রদান করে।

​টপ্পা গানকে লোকগান হিসেবে বিচার করার যুক্তি

​শাস্ত্রীয় ভিত্তিমূল থাকা সত্ত্বেও কেন টপ্পাকে লোকসংগীত বা লৌকিক ধারার কাছাকাছি হিসেবে গণ্য করা হয়, তার প্রধান কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

​১. উৎসগত লৌকিকতা

​টপ্পা গানের আদি রূপটি কোনো দরবারি বা উচ্চাঙ্গ সংগীত ছিল না। পাঞ্জাবের উটচালকদের (উটচালক 'উটওয়াল্লা') লোকসংগীত বা মেঠো গান থেকেই টপ্পার উৎপত্তি। উটের দ্রুত চলাচলের তালে তালে তারা যে সুরের তরঙ্গ সৃষ্টি করত, তাই পরবর্তীতে টপ্পার আকার নেয়। ফলে এর মূল শিকড়টি জড়িয়ে রয়েছে লৌকিক জীবনের সঙ্গে।

​২. আভিজাত্যের অভাব ও সহজ-সরল আবেগ

​ধ্রুপদ বা খেয়ালের মতো টপ্পায় অহেতুক গম্ভীরতা বা রাজকীয় আভিজাত্য নেই। লোকসংগীতের মূল প্রাণ হলো সাধারণ মানুষের মনের সহজ-সরল আবেগ ও অনুভূতির প্রকাশ। বাংলা টপ্পায় (বিশেষ করে রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর টপ্পায়) প্রাত্যহিক জীবনের ব্যাকুলতা, বিরহ, প্রেম ও লৌকিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে—

​"ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে। / আমার স্বভাব এই তোমা বই আর জানিনে।।"

​এই অতি সহজ বোধ্যতা এবং লৌকিক হৃদয়ের বাণী টপ্পাকে লোকগানের কাছাকাছি এনে দেয়।

​৩. ভাষার ব্যবহার (লোকভাষা)

​দরবারি টপ্পায় ফার্সি বা ব্রজবুলির প্রভাব থাকলেও বাংলা টপ্পায় কোনো কৃত্রিম সাধু ভাষা বা জটিল শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। তৎকালীন সমাজ জীবনের কথ্য ও প্রাত্যহিক বাংলা ভাষাতেই গানগুলি রচিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ পাওয়া লোকসংগীতের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।

​৪. লোকসংগীতের বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ

​সহজ ও সংক্ষিপ্ত রূপ: খেয়ালের মতো বিস্তৃতি বা দীর্ঘ আলাপ টপ্পায় থাকে না। ছোট ছোট চরণে খুব দ্রুত সুরের আন্দোলন ঘটিয়ে গানটি শেষ হয়, যা সাধারণ লোকগানের সুসংক্ষিপ্ততার রূপের কথা মনে করিয়ে দেয়।

​জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতা: দরবারি সংগীত সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে থাকলেও বাংলা টপ্পা দ্রুত সাধারণ লোকসমাজে, বিশেষ করে তৎকালীন কলকাতার বাবু কালচারে এবং সাধারণ মানুষের আসরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

​উপসংহার

​উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, টপ্পা গানটি রূপ ও কাঠামোর দিক থেকে রাগাশ্রী বা উপ-শাস্ত্রীয় হলেও, এর উৎস, অন্তর্নিহিত সুরের মেজাজ, সহজ ভাষার ব্যবহার এবং লৌকিক অনুভূতির প্রকাশের দিক থেকে একে লোকসংগীতের মেজাজসম্পন্ন গান হিসেবে বিচার করা সম্পূর্ণ যথার্থ। সংসং সং সং সং সং মূলত, টপ্পা হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামোর মধ্যে লৌকিক প্রাণের এক অপূর্ব ও সার্থক সংমিশ্রণ।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...