সন্ত্রাসবাদ।।সন্ত্রাসবাদ ও ভারতের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সপ্তম সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর। ইউনিট৪।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে 'সন্ত্রাসবাদ' (Terrorism)।আর রাজনৈতিক, সামাজিক বা আদর্শগত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সাধারণ জনগণ ও রাষ্ট্রের ওপর পরিকল্পিত ভয়ভীতি, হিংসা ও সশস্ত্র আগ্রাসন প্রয়োগ করাই হলো সন্ত্রাসবাদ।এই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ দমন এবং এর আইনি কাঠামোর অধ্যয়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। আর এই আলোচনার উপর ভিত্তি করে আমরা বলতে পারি-
'Terrorism' শব্দটি লাতিন শব্দ 'Terrere' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'ভয় দেখানো' বা 'আতঙ্কিত করা'।আসলে সমাজবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে-
সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও সরকারের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শগত লক্ষ্য হাসিল করার জন্য পরিচালিত হিংসাত্মক পদ্ধতিই হলো সন্ত্রাসবাদ। যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো-
১) সন্ত্রাসবাদ হল সংগঠিত হিংসা,এটি কোনো আকস্মিক অপরাধ নয়, বরং সুপরিকল্পিত সশস্ত্র হামলা।
২) সন্ত্রাসবাদীদের রাজনৈতিক বা আদর্শগত লক্ষ্য হলো-এর পেছনে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল, কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থার বিরোধিতা বা ধর্মীয় উগ্রবাদ কাজ করে।
৩) সন্ত্রাসবাদের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবে সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তির চেয়েও বহুগুণ বেশি প্রভাব ফেলা হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
•ভারতে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনের আইনি বিবর্তনঃ ভারত দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদের শিকার। তাই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখতে ভারত সরকার বিভিন্ন সময়ে কড়া আইন প্রণয়ন করেছে।আর সেই আইনগুলি হলো-
•ক) TADA-Terrorist and Disruptive Activities Prevention Act, 1985,সন্ত্রাসবাদী ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৫। যার পটভূমি পাঞ্জাবে খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মোকাবিলার জন্য এই আইনটি তৈরি হয়।এর প্রধান দিক হলো-এতে পুলিশকে সন্দেহভাজনদের দীর্ঘ দিন আটকে রাখা এবং পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়।তবে-
ব্যাপক অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের অভিযোগ ওঠায় ১৯৯৫ সালে এটি বাতিল করা হয়।
•খ)POTA (Prevention of Terrorism Act, 2002সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ আইন, ২০০২।যার পটভূমি হলো-২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভারতীয় সংসদে সন্ত্রাসী হামলার পর এই আইনটি কার্যকর হয়। তবে এই আইনের আইনের প্রধান দিক ছিল-সন্ত্রাসবাদী সংগঠন নিষিদ্ধ করা, সন্দেহভাজনদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠনের বিধান রাখা হয়।তবে- ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়া ও আইনি অপব্যবহারের দায়ে ২০০৪ সালে POTA বাতিল করা হয়।
•গ)UAPA (Unlawful Activities Prevention Act - ১৯৬৭ ও ২০০৪/২০১৯ সংশোধনী),বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন।বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে প্রধান ও শক্তিশালী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন হলো UAPA ২০০৪ সংশোধনী আইন। তবে POTA বাতিল করার পর সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা ও কঠোর বিধানগুলো ১৯৬৭ সালের UAPA-এর মধ্যে যুক্ত করা হয়।যেখানে ২০১৯ সালের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর মাধ্যমে-কোনো সংস্থাকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করার পাশাপাশি যেকোনো ব্যক্তিবিশেষকেও 'সন্ত্রাসবাদী' হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং সেই সাথে কেন্দ্রকে কোনো সম্পত্তি বা অর্থ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে বিস্তৃত অধিকার দেওয়া হয়।
•সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনের সমালোচনামূলক মূল্যায়নঃ
•ইতিবাচক দিকঃ এই আইন দেশের সার্বভৌমত্ব, একতা ও জাতীয় সংহতি রক্ষায় সাহায্য করে।তদন্তে গতি NIA-এর মতো সংস্থাকে বিশেষ অনুসন্ধানী ক্ষমতা দেয়। সন্ত্রাসমূলক কাজে আর্থিক জোগান কার্যকরভাবে বন্ধ করা যায়।
•নেতিবাচক দিকঃদীর্ঘ সময় বিনা বিচারে আটকে রাখা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী। সহজে জামিন না পাওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই জেল খাটতে হয়। বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে এই আইন ব্যবহারের অভিযোগ বারবার ওঠে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোর আইনি কাঠামোর উপস্থিতি অপরিহার্য। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তার নামে যাতে নাগরিকদের মৌলিক ও মানবাধিকার সংকুচিত না হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে কঠোর আইন প্রবর্তন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment