বৈদিক যুগ।।বৈদিক যুগের বর্ণ ব্যবস্থা (Varna System in Vedic Period) সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, বৈদিক যুগে বর্ণভেদ এবং জাতিভেদ পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গীভাবে যুক্ত ছিল। যার ফলে ঐতিহাসিক ব্যাসাম মন্তব্য করেছেন যে, সেই যুগে বর্ণ ও জাতি এক ছিল না। তবে প্রাচীন ভারতের সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল বর্ণ ব্যবস্থা। বৈদিক সমাজকে প্রধানত দুটি পর্বে ভাগ করে আলোচনা করা হয়-ঋগবৈদিক বা আদি বৈদিক যুগ (আনুমানিক ১৫০০-১০০০ খ্রিঃপূঃ) এবং পরবর্তী বৈদিক যুগ (আনুমানিক ১০০০০-৬০০ খ্রিঃপূঃ)। এই দুই পর্বে বর্ণ ব্যবস্থার রূপ ও চরিত্রের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ করা যায়। আর সেখানে-
ঋগ্বেদিক যুগে সামাজিক শ্রেণীবিভাগ বিদ্যমান থাকলেও তা আধুনিক যুগের জাতিভেদ প্রথার মতো কঠোর বা বংশানুক্রমিক ছিল না। শুধু তাই নয় ঋগ্বেদে 'বর্ণ' শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে-
•গাত্রবর্ণ বা গায়ের রঙঃ আর্যদের ফর্সা রঙ ('আর্য বর্ণ') এবং অনার্য তথা দাস বা দস্যুদের কালো রঙ ('দাস বর্ণ') বোঝাতে।
•পেশা বা বৃত্তিঃ পছন্দমতো জীবিকা গ্রহণের স্বাধীনতা নির্দেশ করতে।তবে-
আদি বৈদিক যুগে বর্ণ ব্যবস্থা জন্মভিত্তিক ছিল না, ছিল কর্মভিত্তিক। একজন ব্যক্তি তার যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো পেশা বেছে নিতে পারতেন।যেখানে ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলে এক কবি লিখেছেন-
"আমি একজন কবি, আমার পিতা একজন ভিষক (চিকিৎসক) এবং আমার মা শস্য পিষেন।"
আসলে এটি প্রমাণ করে যে, একই পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন পেশা গ্রহণ করতে পারতেন।
পুরুষসূক্ত ও চতু বর্ণঃ ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিখ্যাত 'পুরুষসূক্ত' সূক্তে প্রথম চার বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) উৎপত্তি সংক্রান্ত রূপক বর্ণনা পাওয়া যায়। এতে বলা হয়—পরম পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য এবং পদযুগল থেকে শূদ্রের জন্ম। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এই অংশটি ঋগ্বেদে পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছিল।
•পরবর্তী বৈদিক যুগে (সাম, যজু, অথর্ববেদ, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদের যুগ) অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তনের সাথে সাথে বর্ণ ব্যবস্থার চরিত্র আমূল বদলে যায়। তবে সেখানে-
জন্মভিত্তিক ও কঠোর রূপ দেখা যেত।এই যুগে বর্ণ ব্যবস্থা কর্মভিত্তিক না থেকে সম্পূর্ণ জন্মভিত্তিক হয়ে ওঠে। জন্মসূত্রে ব্যক্তির সামাজিক স্থান নির্ধারিত হতে শুরু করে।চারটি নির্দিষ্ট বর্ণ ছিল ও তাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। আর সেখানে দেখা যায় যে-
১)ব্রাহ্মণঃ সমাজের শীর্ষ স্থান দখল করেন। ধর্মীয় আচার, যজ্ঞ পরিচালনা এবং শাস্ত্র চর্চা ছিল এদের প্রধান কাজ। এরা কর প্রদান থেকে অব্যাহতি পেতেন।
২)ক্ষত্রিয়ঃ সমাজের দ্বিতীয় স্তরে অবস্থানকারী শাসক ও যোদ্ধা শ্রেণী। দেশের রক্ষা ও শাসন পরিচালনা ছিল এদের কাজ।
৩)বৈশ্যঃ কৃষি, পশুপালন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকর্মে নিযুক্ত তৃতীয় বর্ণ। সমাজের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং করপ্রদানকারী শ্রেণী ছিলেন এরা।
৪)শূদ্রঃ বর্ণ কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তরে থাকা সেবা প্রদানকারী শ্রেণী। ওপরের তিন বর্ণের সেবা করাই ছিল এদের কাজ। এরা বেদ পাঠ বা উপনয়ন (পৈতৈ) সংস্কারের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
•সামাজিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার সূচনাঃ এই যুগে সামাজিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে। বিবাহ এবং আহারের ক্ষেত্রে কঠোর সামাজিক বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। 'অনুলোম' ও 'প্রতিলোম' বিবাহের ফলে একাধিক সংকীর্ণ বা সংকর জাতির উৎপত্তি ঘটে। অস্পৃশ্যতা বা চণ্ডাল প্রথার সূত্রপাতও এই যুগের শেষভাগেই দেখা যায়।
পরিশেষে বিশেষভাবে বলা যায় যে,বৈদিক যুগের বর্ণ ব্যবস্থা সময়ের সাথে সাথে একটি গতিশীল ও উন্মুক্ত ব্যবস্থা থেকে একটি কঠোর ও বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামোয় পরিণত হয়।যেখানে আদি বৈদিক যুগে বর্ণ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল শ্রমবিভাগ।কিন্তু -
পরবর্তী বৈদিক যুগে এটি ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যবাদ এবং সামাজিক শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, যা পরবর্তীকালে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলন (বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম) গড়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। মোট কথা হলো-আদি বৈদিক যুগ ছিল কর্মভিত্তিক, গতিশীল, গাত্রবর্ণ নির্দেশক, সমতাবাদী সমাজ।আর পরবর্তী বৈদিক যুগ ছিল জন্মভিত্তিক, বংশানুক্রমিক, কঠোর, সামাজিক বৈষম্য ও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment