Skip to main content

 

অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন মতে ব্রহ্মের স্বরূপ আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর। নির্ভুলভাবে তথ্যসহ নোটটি ছাত্র ছাত্রীদের পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন।



পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) স্নাতক স্তরের (NEP) প্রথম সেমিস্টারের **দর্শন মাইনর (Philosophy Minor)** পাঠ্যক্রম অনুযায়ী ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রধান শাখা অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে **'ব্রহ্মের স্বরূপ'** একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক আলোচনা।

পরীক্ষায় ৫ বা ১০ নম্বরের প্রশ্নের উপযোগী করে নির্ভুল তথ্য, প্রয়োজনীয় মূল সংস্কৃত পরিভাষা ও দার্শনিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নোটটি নিচে প্রস্তুত করে দেওয়া হলো।

# অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন মতে ব্রহ্মের স্বরূপ (Concept of Brahman in Advaita Vedanta)

## ভূমিকা

ভারতীয় দর্শনের বেদান্ত শাখায় অদ্বৈত বেদান্তের প্রধান আচার্য **শ্রীমৎ শংকরাচার্য** উপনিষদের মূল ভাবধারাকে আশ্রয় করে অদ্বৈতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। অদ্বৈত বেদান্তের মূল বক্তব্যকে প্রকাশ করতে গিয়ে বলা হয়েছে— **"ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ"** (অর্থাৎ একমাত্র ব্রহ্মই সত্য, জগৎ মিথ্যা এবং জীব প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নয়)। অদ্বৈত বেদান্তমতে পরম ও চরম পরমার্থিক সত্তাই হলেন **ব্রহ্ম**।

## ১. ব্রহ্মের সাধারণ ও লক্ষণাত্মক স্বরূপ

অদ্বৈত বেদান্তে ব্রহ্মকে **অনন্ত, অসীম, অদ্বিতীয় ও নিগুণ** হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আচার্য শংকর ব্রহ্মের স্বরূপকে স্পষ্ট করতে দুটি প্রধান লক্ষণের কথা বলেছেন:

### ক. স্বরূপ লক্ষণ (Essential Characteristics)

যে লক্ষণ বস্তুর ভেতরের মূল ও নিজস্ব প্রকৃতিকে নির্দেশ করে এবং বস্তু থেকে কখনো পৃথক হয় না, তাকে স্বরূপ লক্ষণ বলে।

অদ্বৈত মতে ব্রহ্মের স্বরূপ লক্ষণ হলো— **সচ্চিদানন্দ (সৎ + চিত + আনন্দ)**।

 * **সৎ (Existence):** ব্রহ্ম একমাত্র অবিনাশী ও ত্রিকাল অবাধিত সত্য (যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে কখনোই রূপান্তরিত বা বিনষ্ট হয় না)।

 * **চিত (Consciousness):** ব্রহ্ম কোনো বস্তু নয়, তিনি স্বপ্রকাশ জ্ঞানস্বরূপ বা বিশুদ্ধ চৈতন্য।

 * **আনন্দ (Bliss):** ব্রহ্ম সমস্ত দুঃখের অতীত এবং পরম সুখ ও আনন্দের উৎস।

> **উপনিষদের বাণী:** *"সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম"* — অর্থাৎ ব্রহ্মই সত্য, ব্রহ্মই জ্ঞান এবং ব্রহ্মই অনন্ত।

### খ. তটস্থ লক্ষণ (Accidental Characteristics)

যে লক্ষণ বস্তুর ক্ষণস্থায়ী বা বাহ্যিক পরিচয় প্রকাশ করে, তাকে তটস্থ লক্ষণ বলে।

 * জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় বা প্রলয়ের কারণ হিসেবে ব্রহ্মকে যে পরিচয় দেওয়া হয়, তাই হলো ব্রহ্মের তটস্থ লক্ষণ।

 * ব্রহ্ম স্বয়ং অপরিবর্তনীয় হয়েও মায়ার উপাধি গ্রহণ করে এই দৃশ্যমান বিশ্বের সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংসের হেতু হিসেবে প্রতিভাত হন।

## ২. ব্রহ্মের দ্বিবিধ রূপ: নির্গুণ ও সগুণ ব্রহ্ম

আচার্য শংকর বিচার ও উপলব্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রহ্মের দুটি রূপ স্বীকার করেছেন:

```

                                  ┌───────────────────────────┐

                                  │ অদ্বৈত বেদান্তে ব্রহ্ম │

                                  └─────────────┬─────────────┘

                                                │

                       ┌────────────────────────┴────────────────────────┐

                       │ │

            ┌──────────┴──────────┐ ┌──────────┴──────────┐

            │ ১. নির্গুণ ব্রহ্ম │ │ ২. সগুণ ব্রহ্ম │

            │ (পরা বিদ্যাবেদ্য) │ │ (অপরা বিদ্যাবেদ্য) │

            └──────────┬──────────┘ └──────────┬──────────┘

                       │ │

        ├─ সত্তা: পরমার্থিক (Ultimate) ├─ সত্তা: ব্যবহারিক (Empirical)

        ├─ মায়ার অতীত (Beyond Maya) ├─ মায়া দ্বারা উপহিত (Associated with Maya)

        ├─ বাক্য ও মনের অতীত (Indescribable) ├─ উপাসনা ও ভক্তির বিষয় (Personal God)

        └─ পরিচয়: "নেতি নেতি" (Neti-Neti) └─ পরিচয়: ঈশ্বর (Ishvara)


```

### ১. নির্গুণ ব্রহ্ম (Absolute Brahman / Higher Brahman)

 * **সংজ্ঞা:** নির্গুণ ব্রহ্মই পরমার্থতঃ একমাত্র সত্য। তিনি গুণহীন, আকারহীন, নিরপেক্ষ ও মায়ার অতীত।

 * **নেতিবাচক বর্ণনা ("নেতি নেতি"):** উপনিষদে নির্গুণ ব্রহ্মকে ভাষা বা বুদ্ধির সাহায্যে ইতিবাচকভাবে প্রকাশ করা অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছে। তাই তাঁকে "নেতি, নেতি" (*ইহা নয়, ইহা নয়*) বাক্য দ্বারা ব্যক্ত করা হয়। অর্থাৎ তিনি রূপ নন, রস নন, গুণ নন—সমস্ত জাগতিক সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে।

 * **জ্ঞানের বিষয়:** নির্গুণ ব্রহ্ম পরমার্থিক জ্ঞানের (পরাবিদ্যা) মাধ্যমে অনুভূতির বিষয়।

### ২. সগুণ ব্রহ্ম বা ঈশ্বর (Personal God / Lower Brahman)

 * **সংজ্ঞা:** বিশুদ্ধ নির্গুণ ব্রহ্ম যখন অবিদ্যা বা মায়া নামক শক্তির উপাধি গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে **সগুণ ব্রহ্ম** বা **ঈশ্বর** বলা হয়।

 * **ভূমিকা:** সগুণ ব্রহ্ম হলেন জগতের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও ধ্বংসকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান এবং ভক্তের উপাস্য।

 * **সত্তা:** সগুণ ব্রহ্মের সত্তা পরমার্থিক নয়, **ব্যবহারিক**। যতক্ষণ জীব অবিদ্যা বা অজ্ঞানের বশে থাকে, ততক্ষণ সগুণ ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব সত্য। তত্ত্বজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হলে সগুণ ব্রহ্ম নির্গুণ ব্রহ্মেই বিলীন হয়ে যান।

## ৩. ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক (বিবর্তবাদ)

অদ্বৈত বেদান্তে ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক বোঝাতে **'বিবর্তবাদ' (Theory of Vivarta/Illusion)** গ্রহণ করা হয়েছে।

 * **বিবর্ত কী?:** কারণ যখন কোনো বাস্তব পরিবর্তন ছাড়াই কেবল মিথ্যা বা ভাসমান রূপে অন্য কিছু হিসেবে প্রতিভাত হয়, তাকে বিবর্ত বলে। (যেমন: অন্ধকারে দড়িকে সাপ বলে ভুল করা)।

 * **প্রয়োগ:** ব্রহ্মই জগতের উপাদান ও নিমিত্ত কারণ। কিন্তু ব্রহ্ম বাস্তবে জগতে রূপান্তরিত হন না (যা পরিণামবাদ); বরং মায়ার প্রভাবে ব্রহ্মের ওপর জগতের মিথ্যা আরোপ হয়। সুতরাং, জগৎ হলো ব্রহ্মের **বিবর্ত** বা অবাস্তব রূপান্তর।

## ৪. ব্রহ্ম ও জীবের সম্পর্ক

অদ্বৈত বেদান্ত মতে জীব ও ব্রহ্ম মূলতঃ অভিন্ন।

 * অবিদ্যা বা অজ্ঞানের কারণে পরমাত্মা বা ব্রহ্ম দেহ-মন-বুদ্ধিরূপ উপাধিতে নিজেকে আবদ্ধ মনে করেন এবং নিজেকে 'জীব' বলে ভুল করেন।

 * যখন মহাবাক্যের (*"তত্ত্বমসি"* - 'তুমিই সেই ব্রহ্ম') মাধ্যমে অবিদ্যা দূর হয়, তখন জীব অনুধাবন করে— **"অহং ব্রহ্মাস্মি"** (আমিই ব্রহ্ম)।

## মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ (Conclusion)

উপসংহারে বলা যায়, অদ্বৈত বেদান্ত মতে ব্রহ্ম কোনো ব্যক্তি বা সাধারণ সত্তা নন; তিনি সর্বব্যাপী, অদ্বিতীয় ও বিশুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ।

পরীক্ষার খাতায় পয়েন্ট আকারে লেখার জন্য মূল বাক্যগুলি হলো:

১. ব্রহ্মই পরম সত্য এবং তিনি সচ্চিদানন্দস্বরূপ।

২. নির্গুণ ব্রহ্ম পরমার্থিক সত্য, আর সগুণ ব্রহ্ম (ঈশ্বর) মায়াশ্রিত ব্যবহারিক সত্য।

৩. বিশ্বজগৎ ব্রহ্মের মায়িক বিবর্ত মাত্র।

৪. মোক্ষ বা মুক্তি হলো ব্রহ্মের সাথে জীবের স্বাতন্ত্র্যহীন অভেদ উপলব্ধি করা।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...