Skip to main content

 পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) প্রথম সেমিস্টারের সমাজবিজ্ঞান (Sociology) মাইনর কোর্সের ৫/১০ নম্বরের প্রশ্নের উপযোগী করে প্রস্তুত উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের সম্পর্ক ও পার্থক্য (Relationship and Differences between Sociology and History)

ভূমিকা

সমাজতত্ত্ব (Sociology) এবং ইতিহাস (History) দুটিই সামাজিক বিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ শাখা। মানবসমাজের বিকাশ, বিবর্তন এবং পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবনে এই দুটি শাস্ত্র একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী জি. ই. হাওয়ার্ড (G. E. Howard) যথার্থই বলেছেন, "ইতিহাস হলো অতীতের সমাজতত্ত্ব এবং সমাজতত্ত্ব হলো বর্তমানের ইতিহাস" (History is past Sociology, and Sociology is present History)।

সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের সম্পর্ক (Relationship)

১. পরস্পর নির্ভরশীলতা (Interdependence):

 * ইতিহাসের ওপর সমাজতত্ত্বের নির্ভরতা: সমাজতত্ত্বকে যেকোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান (যেমন— পরিবার, বিবাহ, ধর্ম বা রাষ্ট্র) বুঝতে হলে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানতে হয়। ইতিহাসের সরবরাহ করা তথ্য ও উপাত্ত সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

 * সমাজতত্ত্বের ওপর ইতিহাসের নির্ভরতা: ইতিহাস কেবল ঘটে যাওয়া ঘটনার তালিকা নয়; ঘটনার পেছনের সামাজিক কারণ, সামাজিক কাঠামো ও প্রভাব বুঝতে ইতিহাসবিদদের সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হয়।

২. সামাজিক পরিবর্তনের ব্যাখ্যা (Understanding Social Change):

সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তা সমাজতত্ত্ব আলোচনা করে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ধারা বা উৎস অনুধাবন করতে হলে ইতিহাসের সাহায্য নিতে হয়। যেমন— শিল্প বিপ্লব বা ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে দুটি শাস্ত্রই হাত ধরাধরি করে চলে।

৩. ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্বের উদ্ভব (Historical Sociology):

দুই শাস্ত্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে 'ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্ব' নামে এক নতুন শাখার জন্ম হয়েছে, যেখানে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয় (যেমন— মাক্স ভেবার বা কার্ল মার্ক্সের গবেষণা)।

সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের পার্থক্য (Differences)

যদিও দুটি বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, তবুও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, বিষয়বস্তু ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে:

| পার্থক্যের বিষয় | সমাজতত্ত্ব (Sociology) | ইতিহাস (History) |

|---|---|---|

| ১. সময়ের পরিধি | সমাজতত্ত্ব প্রধানত বর্তমান সমাজ, সামাজিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। | ইতিহাস প্রধানত অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনা, ধারাবাহিক কালপঞ্জি ও অতীত সমাজ নিয়ে আলোচনা করে। |

| ২. আলোচনার প্রকৃতি | এটি একটি সাধারণীকরণমূলক (Generalizing) শাস্ত্র। এটি সামাজিক ঘটনার পেছনের সাধারণ নিয়ম বা ধারা খোঁজার চেষ্টা করে। | এটি একটি স্বাতন্ত্র্যসূচক (Particularizing) শাস্ত্র। এটি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট সময়কালকে গুরুত্ব দেয়। |

| ৩. গবেষণার ক্ষেত্র | সমাজতত্ত্ব সামাজিক কাঠামো, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, দলগত আচরণ ও সামাজিক প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করে। | ইতিহাস প্রধানত বিশেষ কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ, রাজবংশ বা যুগান্তকারী ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। |

| ৪. গবেষণাপদ্ধতি | সমাজতত্ত্ব তথ্য সংগ্রহের জন্য জরিপ (Survey), পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে। | ইতিহাস তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রাচীন নথি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, সরকারি রেকর্ড ও প্রাচীন দলিলের ওপর নির্ভর করে। |

| ৫. দৃষ্টিভঙ্গি | সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি হলো বিশ্লেষণাত্মক (Analytical)। | ইতিহাসের দৃষ্টিভঙ্গি হলো প্রধানত বর্ণনামূলক (Descriptive)। |

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্যের প্রাচীরটি কেবল অধ্যয়নের সুবিধার্থে তৈরি। বাস্তবে দুটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক। অতীতকে না জানলে যেমন বর্তমানকে ব্যাখ্যা করা যায় না, ঠিক তেমনি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অসম্ভব। তাই মানবসমাজকে সঠিকভাবে বুঝতে এই দুটি সামাজিক বিজ্ঞানের যৌথ চর্চা অপরিহার্য।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...