শাক্ত পদকর্তা হিসেবে রামপ্রসাদ সেনের কবি কৃতিত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, দ্বিতীয় সেমিস্টার, বাংলা মেজর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,অষ্টাদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী শাক্ত পদকর্তা রামপ্রসাদ সেন।তবে তিনি শুধু একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন এক মহান সাধক।তাই তাঁর রচিত শ্যামা সংগীতগুলি একদিকে যেমন কাব্যগুণে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে তেমনি গভীর অধ্যাত্মভাব ও ভক্তিতে পরিপূর্ণ।আসলে তাঁর কবি-প্রতিভা মূলত তিনটি প্রধান দিকে বিকশিত হয়েছিল। সেই তিনটি বিকশিত দিক হলো-
১)ভাবের গভীরতা ও মানবিক আবেদন । ২)ভাষার সরলতা এবং সাবলীলতা। ৩) নিজস্ব কাব্যশৈলীর সৃষ্টি ও সঙ্গীতের মিশ্রণ।
১) ভাবের গভীরতা ও মানবিক আবেদনঃ রামপ্রসাদের পদগুলি কেবল দেবী কালীর স্তুতি নয়।এ এক ভক্তের সঙ্গে তার আরাধ্যা দেবীর এক বিচিত্র সম্পর্কের মেলবন্ধন। এই কালীর স্ততি পদে মা কালী কখনও জননী, কখনও কন্যা, আবার কখনও বন্ধুরূপে ধরা দিয়েছেন। তিনি দেবীকে কেবল অলৌকিক শক্তির আধার হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে মানবীয় সম্পর্কের বাঁধনে বেঁধেছেন। যেখানে- •রামপ্রসাদের পদে কালী কখনো তার অভাব-অভিযোগের কারণ, কখনো তার দুঃখের সঙ্গী। এই মানবিক আবেদনই তার পদগুলিকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা দেখি-
"মা আমায় ঘুরাবি কত" বা "এবার কালী তোমায় খাব" -আহলে রামপ্রসাদ সেনের এই পদগুলিতে ভক্তের আকুতি, অভিমান এবং ভালোবাসার এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়।
২)ভাষার সরলতা ও সাবলীলতাঃ রামপ্রসাদ তাঁর শাক্তপদ রচনায় অত্যন্ত সহজ ও সরল ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি সংস্কৃত বা পন্ডিতী ভাষার জটিলতাকে পরিহার করে চলতেন।তাই তাঁর পদে ব্যবহৃত শব্দগুলি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কথা বলে। এই সরলতার কারণে তার গানগুলি নিরক্ষর মানুষও সহজেই বুঝতে পারত এবং এর ভাবের সঙ্গে একাত্ম হতে পারত।আর সেখানে-
রামপ্রসাদ সেন এমন সব উপমা ও চিত্রকল্প ব্যবহার করতেন যা সাধারণের কাছে পরিচিত। পরিচিত সেই পথে আমরা দেখি- "মন রে কৃষি কাজ জান না", "কালী কেবলি কি তুই কালো। রামপ্রসাদের ভাষার এই সরলতা তাঁর কাব্যকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।
৩)নিজস্ব কাব্যশৈলী ও সংগীতের মিশ্রণঃরামপ্রসাদ সেন শাক্ত পদকর্তা হিসেবে এক নতুন কাব্যশৈলীর জন্ম দিয়েছিলেন।যে পদ 'রামপ্রসাদী সুর' নামে পরিচিত। এই সুর একদিকে যেমন কীর্তনের সুরের মতো ভক্তিপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি লোকসংগীতের মতো স্বতঃস্ফূর্ত।আসলে- রামপ্রসাদ সেন তাঁর পদে ভক্তি, দর্শন এবং কাব্যকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন।তাই তাঁর গানগুলি কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং গাওয়ার জন্যই রচিত হয়েছিল। এই গীতিময়তা তার পদগুলিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। এছাড়াও- রামপ্রসাদ সেন রূপক ও প্রতীকী অর্থে নানা বিষয়কে উপস্থাপন করেছেন। যেমন, তার পদে মনকে 'কৃষিক্ষেত্র', বিষয়বাসনাকে 'আগাছা' এবং সাধনভজনকে 'চাষ' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রামপ্রসাদ সেন তাঁর পদগুলিতে ভক্তি, প্রেম, অভিমান, এবং গভীর দার্শনিক চিন্তাকে এক নতুন রূপ দিয়েছেন। তাঁর সহজ-সরল ভাষা এবং মানবিক আবেদন শাক্ত সাহিত্যকে এক নতুন পথ দেখিয়েছিল। আসলে। রামপ্রসাদ সেন প্রথম শাক্ত পদকর্তা, যিনি দেবীকে কেবল ভয়ংকরী রূপে নয়, বরং একজন সাধারণ ভক্তের কাছে তার প্রিয়জন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই কারণেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শাক্ত পদকর্তা হিসেবে রামপ্রসাদ সেনের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য একথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment