Skip to main content

উপন্যাস ও রোমান্সের সংজ্ঞা এবং এদের মধ্যকার ১০টি মৌলিক পার্থক্য লেখো।

উপন্যাস ও রোমান্সের সংজ্ঞা এবং এদের মধ্যকার ১০টি মৌলিক পার্থক্য লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) চতুর্থ সেমিস্টারের বাংলা মেজর DS-5, খ.

     •উপন্যাসঃ উপন্যাস হলো গদ্যে রচিত এমন এক দীর্ঘ আখ্যানমূলক সাহিত্যকর্ম, যেখানে বাস্তব জীবনের প্রতিফলন ঘটে। এতে চরিত্রগুলোর জীবনসংগ্রাম, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে ফুটে ওঠে। সংক্ষেপে, যা বাস্তবসম্মত এবং জীবনের কাছাকাছি, তাই উপন্যাস। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে,তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'গণদেবতা' বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মানদীর মাঝি' শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

     •রোমান্সঃ রোমান্স হলো এমন এক ধরনের আখ্যান যেখানে কল্পনাপ্রসূত, অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত ঘটনার প্রাধান্য থাকে। এখানে বাস্তবতা অপেক্ষা বীরত্ব, প্রেম এবং রোমাঞ্চকর অভিযানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। রোমান্সের জগৎ সাধারণত দৈনন্দিন ধূসর বাস্তবতা থেকে দূরে এক মায়াবী জগৎ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দুর্গেশনন্দিনী' বা 'কপালকুণ্ডলা' রোমান্সধর্মী উপন্যাস। 

উপন্যাস ও রোমান্সের স্বরূপ বুঝতে নিচে এদের পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হলো-

   ১) বাস্তবতার নিরিখে উপন্যাসের মূল ভিত্তি হলো কঠোর বাস্তবতা। এটি আমাদের চেনা জগতের প্রতিচ্ছবি।কিন্তু-

       •রোমান্সের ভিত্তি হলো কল্পনা। এটি আমাদের চেনা জগতের বাইরের কোনো মায়াজাল।

    ২)চরিত্রায়ণের নিরিখে বলা হয় উপন্যাসের চরিত্রগুলো রক্ত-মাংসের মানুষ এবং তাদের দোষ-গুণসহ চিত্রিত করা হয়।কিন্তু -

       •রোমান্সের চরিত্রগুলো প্রায়ই অতিমানবীয় গুণসম্পন্ন বা টাইপ চরিত্র (যেমন: আদর্শ রাজা বা বীর)।

    ৩)কার্যকারণ সম্পর্কগতভাবে উপন্যাসে প্রতিটি ঘটনার পেছনে যুক্তিগ্রাহ্য ও বাস্তবসম্মত কার্যকারণ সম্পর্ক থাকে।কিন্তু -

   • রোমান্সের ঘটনাপ্রবাহ অনেক সময় আকস্মিক, অলৌকিক বা দৈবনির্ভর হয়।

   ৪)পরিবেশ ও সময়ের নিরিখে উপন্যাসে সমকালীন সমাজ, নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা এবং কালানুক্রমিক সময়ের উল্লেখ থাকে।কিন্তু-

     •রোমান্সের পরিবেশ প্রায়ই কাল্পনিক, দূরবর্তী কোনো দেশ বা অনির্দিষ্ট প্রাচীন সময়ের প্রেক্ষাপটে হয়।

     ৫) ভাষা ও শৈলীগত দিক থেকে বলা হয় ভাষা সাধারণত চলিত বা প্রাত্যহিক জীবনের কথ্য রীতির কাছাকাছি এবং বিশ্লেষণধর্মী। কিন্তু-

      •রোমান্সের ভাষা অনেক সময় অলঙ্কারবহুল, কাব্যিক এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ হয়ে থাকে। 

     ৬)মনস্তত্ত্বগতভাবে উপন্যাসে চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও মানসিক বিবর্তনকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।কিন্তু-

       • রোমান্সের ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের চেয়ে বাহ্যিক ঘটনা ও রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রাধান্য বেশি থাকে।

     ৭)উদ্দেশ্য গত বলা হয় যে, উপন্যাসে জীবনের সত্যকে উন্মোচন করা এবং সমাজকে গভীরভাবে চেনা উপন্যাসের লক্ষ্য।কিন্তু-

     •রোমান্সের ক্ষেত্রে পাঠককে বিস্ময় ও আনন্দের এক অলৌকিক জগতে নিয়ে যাওয়াই এর প্রধান লক্ষ্য।

    ৮)দৈনন্দিনতা বিচারে উপন্যাসে সাধারণ মানুষের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা বা আটপৌরে জীবন এখানে মহিমা পায়।কিন্তু-

      •রোমান্সে অসাধারণ ঘটনা বা অলৌকিক বীরত্বগাথা এখানে মূল উপজীব্য বিষয়।

     ৯)উপন্যাসের সমাপ্তি ট্র্যাজিক বা অমীমাংসিত হতে পারে, যা জীবনের মতোই অনিশ্চিত।কিন্তু -

      •রোমান্সের সমাপ্তি সাধারণত মিলনান্তক বা একটি নৈতিক জয়ের মাধ্যমে শেষ হয়।

        পরিশেষে যেটি বলা ভীষণ প্রয়োজন সেটি হলো-বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে 'উপন্যাস সম্রাট' বলা হলেও তাঁর প্রথম দিকের অনেক সৃষ্টিকে বিশুদ্ধ উপন্যাসের চেয়ে 'রোমান্স' বলা অধিক যুক্তিযুক্ত। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাংলা উপন্যাস আধুনিক বাস্তবতার রূপ পরিগ্রহ করে।

 ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন,টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও এবং পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবংSHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH sir 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...