Skip to main content

টেনিস কোর্টের শপথ

টেনিস কোর্টের শপথ-  টেনিস কোর্টের শপথ (১৭৮৯), প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর (History Minor) পাঠ্যক্রম।

        আলোচনার শুরুতেই বলে রাখি যে,১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২০শে জুন ফ্রান্সের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা ভার্সাইয়ের টেনিস খেলার মাঠে যে শপথ গ্রহণ করেছিলেন, তা 'টেনিস কোর্টের শপথ'(Tennis Court Oath) নামে পরিচিত। এটি ছিল ফরাসি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রথম সংগঠিত বিদ্রোহ এবং আধুনিক গণতন্ত্রের পথে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।আর সেই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ছিল-

      ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ই মে দীর্ঘ ১৭৫ বছর পর 'এস্টেটস জেনারেল'বা জাতীয় সভার অধিবেশন আহ্বান করেন।এই সভায় তিনটি সম্প্রদায় ছিল। আর সেই সম্প্রদায় গুলি হলো-

১. যাজক (প্রথম সম্প্রদায়) •২. অভিজাত (দ্বিতীয় সম্প্রদায়)

           •৩. সাধারণ মানুষ (তৃতীয় সম্প্রদায়)

          আসলে তৃতীয় সম্প্রদায়ের দাবি ছিল যে, ভোটদানের পদ্ধতি হতে হবে 'মাথা পিছু', কিন্তু রাজা ও প্রথম দুই সম্প্রদায় 'শ্রেণি পিছু' ভোটের দাবিতে অনড় থাকে। এই বিরোধের জেরে ১৭ই জুন তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নিজেদের 'জাতীয় সভা' (National Assembly) বলে ঘোষণা করেন। আর সেইদিন সেই ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি-

          ১৭ই জুনের ঘোষণার পর রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে ২০শে জুন তৃতীয় সম্প্রদায়ের সভাকক্ষটি বন্ধ করে দেন। প্রতিনিধিরা অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে দেখেন যে কক্ষটি তালাবন্ধ এবং সশস্ত্র প্রহরী মোতায়েন। এই অবস্থায় তারা বিচলিত না হয়ে নিকটবর্তী একটি ইনডোর টেনিস খেলার মাঠে সমবেত হন। সেখানে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও নেতা জ্যাঁ সিলভ্যাঁ বেইলি-র (Jean Sylvain Bailly) সভাপতিত্বে তারা এই মর্মে শপথ নেন যে—

"যতদিন না ফ্রান্সের জন্য একটি লিখিত সংবিধান রচিত হচ্ছে, ততদিন তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন এবং কক্ষ ত্যাগ করবেন না।"

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ফলাফল দিক থেকে আমরা আলোচনা করলে জানতে পারি যে,টেনিস কোর্টের শপথ কেবল একটি প্রতিজ্ঞা ছিল না, এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী-

       ১. রাজতন্ত্রের নৈতিক পরাজয়ঃএই শপথের মাধ্যমে ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের স্বৈরাচারী ক্ষমতার অবসান ঘটে। রাজা শেষ পর্যন্ত জনমতের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং ২৭শে জুন তিন সম্প্রদায়ের যৌথ অধিবেশনের অনুমতি দেন।

      ২. সার্বভৌমত্বের হস্তান্তরঃ এতদিন বিশ্বাস করা হতো সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস হলেন 'রাজা'। কিন্তু এই শপথ প্রমাণ করল যে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির উৎস হলো 'জনগণ'এবং তাদের প্রতিনিধিরা।

        ৩. জাতীয় সভার বৈধতাঃ এই ঘটনার পর তৃতীয় সম্প্রদায়ের 'জাতীয় সভা' প্রকৃত অর্থেই আইনসভায় রূপান্তরিত হয় এবং সংবিধান রচনার কাজ (Constituent Assembly) শুরু করার বৈধ অধিকার পায়।

      ৪. বিপ্লবের গতিপথ নির্ধারণঃ টেনিস কোর্টের শপথ ফরাসি বিপ্লবকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য দান করে। এটিই পরবর্তীকালে বাস্তিল দুর্গের পতন (১৪ই জুলাই, ১৭৮৯) এবং 'মানুষ ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা'র পথ প্রশস্ত করেছিল।

      ৫. জাতীয় সংহতির প্রতীকঃ এটি ছিল ফরাসি মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের একতার প্রতীক। যা প্রমাণ করেছিল যে, ঐক্যবদ্ধ জনশক্তির সামনে পেশীশক্তি বা রাজশক্তি টিকতে পারে না।

           পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, টেনিস কোর্টের শপথ ছিল ফরাসি বিপ্লবের প্রথম রক্তপাতহীন বিজয়। ঐতিহাসিক ল্যাভিস-এর মতে-"এটি ছিল ফরাসি বিপ্লবের প্রকৃত সূচনা।" এই শপথের মাধ্যমেই ফ্রান্স মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্র থেকে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে পা বাড়িয়েছিল।

 ঠিক এরকম অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher  Kobita Sundarban YouTube channel SAMARESH SIR 


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...