Skip to main content

ধ্বনি, অক্ষর ও বর্ণের স্বরূপ ও গুরুত্ববাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টিকর্তা ও এর প্রথম প্রয়োগ।

ধ্বনি, অক্ষর ও বর্ণের স্বরূপ ও গুরুত্ব ও বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টিকর্তা ও এর প্রথম প্রয়োগ।

    ১)ধ্বনিঃ মানুষের বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত সূক্ষ্মতম ও মৌলিক  শব্দই হলো ধ্বনি।এটি শ্রুতিগ্রাহ্য অর্থাৎ শুধু কানে শোনা যায়।উদাহরণ- মুখ দিয়ে উচ্চারিত 'অ', 'আ', 'ক্' ইত্যাদি।

     ২)অক্ষর বা দলঃ এক বাক্প্রত্যাহারে (অর্থাৎ মুখের এক ধাক্কায় বা একপ্রয়াসে) শব্দের যতটুকু অংশ উচ্চারিত হয়, তাকে অক্ষর বা দল বলে। অক্ষর মূলত ধ্বনির সমষ্টি বা একক।উদাহরণঃ'কলকাতা' শব্দটি এক ধাক্কায় উচ্চারণ করলে হয়: কল্-কা-তা (এখানে ৩টি অক্ষর রয়েছে)।

     ৩) বর্ণঃধ্বনির লিখিত রূপ বা দৃশ্যমান প্রতীকই হলো বর্ণ। যা চোখে দেখা যায় এবং খাতায় লেখা যায়।উদাহরণ- উচ্চারিত 'অ' ধ্বনিটিকে যখন কাগজে 'অ' চিহ্নে লেখা হয়, তখন তা বর্ণ।

ধ্বনি, অক্ষর ও বর্ণের গুরুত্ব

     • ধ্বনি ভাষার প্রাথমিক উপাদান। ধ্বনি না থাকলে ভাষার মৌখিক অস্তিত্বই থাকত না।

     • বর্ণ আবিষ্কারের ফলেই মানুষের মুখে বলা কথা ও ভাব স্থায়িত্ব পেয়েছে এবং সাহিত্য লিখিত রূপে সংরক্ষিত হতে পেরেছে।

       •ছন্দ ও কবিতার প্রাণ (অক্ষরের গুরুত্ব): বাংলা কাব্যসাহিত্যে ছন্দ (যেমন: দলবৃত্ত, কলাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত) পুরোটাই অক্ষরের বা দলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। মাত্রাগণনা ও লয় অক্ষরের ওপরই নির্ভর করে। ধ্বনি ও বর্ণ পরিচয় ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ ও বানানরীতি বজায় রাখতে অপরিহার্য।

 ২. বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টিকর্তা ও এর প্রথম প্রয়োগ

       •বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রথাগত অন্ত্যমিল ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টিকর্তা হলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগপ্রবর্তক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

      পাশ্চাত্য সাহিত্যের (বিশেষ করে মিল্টনের Paradise Lost অনুকরণে ও প্রেরণায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা কাব্যে এই বৈপ্লবিক ছন্দের প্রবর্তন করেন।

•প্রথম ব্যবহার (গ্রন্থ):মাইকেল মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রথম ব্যবহার করেন তাঁর পৌরাণিক কাব্য 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য'-এ (প্রকাশকাল: ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ)।

      'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য' রচনার ঠিক আগে ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁর 'পদ্মাবতী' নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক-এ প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে কতিপয় পঙ্ক্তিতে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ করেছিলেন। তবে সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য'-তেই তিনি প্রথম সফলভাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দ রূপায়িত করেন।

•অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব:

      •অন্ত্যমিলের বর্জনঃ  পয়ার ছন্দের ঐতিহ্যবাহী পর্বান্তিক বা চরণান্তিক মিল (যেমন: 'কথা / সমান', 'কহে / পুণ্যবান') অমিত্রাক্ষর ছন্দে সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়।

      •প্রবহমানতাঃ এই ছন্দে বাক্যের অর্থ এক চরণে শেষ না হয়ে অনায়াসে পরবর্তী চরণে প্রবাহিত হতে পারে।

       •যতিচিহ্নের স্বাধীন ব্যবহারঃপয়ারের মতো চরণের শেষে থামার বাধ্যবাধকতা নেই; ভাব অনুযায়ী বাক্যের যেকোনো স্থানে যতি বা বিরামচিহ্ন বসানো যায়।মধুসূদন দত্তের 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য'-এ অমিত্রাক্ষর ছন্দের সূচনা হলেও, পরবর্তীতে তাঁর অমর মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য' (১৮৬১)-এ এই ছন্দ চূড়ান্ত সার্থকতা ও পূর্ণতা লাভ করে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •





Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...