Skip to main content

বাংলা ছন্দের বিজ্ঞানসম্মত নামকরণে এবং ছন্দতত্ত্বের ইতিহাসে প্রবোধচন্দ্র সেনের অবদান আলোচনা করো।

বাংলা ছন্দের বিজ্ঞানসম্মত নামকরণে এবং ছন্দতত্ত্বের ইতিহাসে প্রবোধচন্দ্র সেনের অবদান আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

       আলোচনা শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে, বাংলা  ছন্দশাস্ত্রকে বিশৃঙ্খলা, ভ্রান্তি ও প্রথাগত সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুকরণ থেকে মুক্ত করে একটি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক ভিতের ওপর দাঁড় করানোর একক কৃতিত্ব প্রবোধচন্দ্র সেনের (১৮৯৭–১৯৮৬)। প্রবোধচন্দ্র সেনের আত্মপ্রকাশের পূর্বে বাংলা ছন্দের নানাবিধ নামকরণ ও বিভাজন নিয়ে আলংকারিকদের মধ্যে চরম মতভেদ ছিল। তিনিই প্রথম ধ্বনিবিজ্ঞান ও ব্যাকরণের নিরিখে বাংলা ছন্দের রূপ প্রকাশ করেন এবং বাংলা ছন্দের তিন প্রধান রীতির বিজ্ঞানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য নামকরণ প্রদান করেন। তাই বাংলা ছন্দতত্ত্বের ইতিহাসে তাঁকে ‘আধুনিক বাংলা ছন্দশাস্ত্রের জনক’ বলা হয়।

     •বাংলা ছন্দের ত্রিমুখী বিভাজন ও বিজ্ঞানসম্মত নামকরণ।প্রবোধচন্দ্র সেনের সবচেয়ে স্মরণীয় অবদান হলো-তিনি বাংলা কবিতার ছন্দকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তাকে ৩টি মূল ধারায় বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি রীতির স্বরুপ প্রকাশ করে বিজ্ঞানসম্মত নামকরণ করেন।তবে-

      পূর্বে এই ছন্দগুলোকে একেকজন একেক নামে ডাকতেন (যেমন: পয়ার, অমিত্রাক্ষর, মাত্রাবৃত্ত, লৌকিক ইত্যাদি)। প্রবোধচন্দ্র সেনই প্রথম এদের ধ্বনিভিত্তিক ও মাত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্পষ্ট নামকরণ করেন। আর সেখানে-

      ১)দলবৃত্ত ছন্দঃআগের নাম ছড়াড় ছন্দ,লৌকিক ছন্দ, স্বরবৃত্ত ছন্দ। প্রবোধচন্দ্র সেন অক্ষরের আধুনিক ধ্বনিবিজ্ঞানসম্মত নাম দেন ‘দল’। তিনি দেখান যে, এই ছন্দে মুক্তদল ও রুদ্ধদল উভয়কেই এক-এক মাত্রা ধরে দলের ভিত্তিতে ছন্দ গণনা করা হয়। তাই এটি ‘দলবৃত্ত ছন্দ’। আর এই ছন্দটি-

        দ্রুত লয়ের, স্বরপ্রঘাতপ্রধান এবং খাঁটি বাংলা ভাষার মুখের ছন্দ।উদাহরণ-"বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর / নদে এল বান।"

      •২)কলাবৃত্ত ছন্দঃ যার আগের নাম মাত্রাবৃত্ত ছন্দ, ধ্বনিপ্রধান ছন্দ, সংগীতাত্মক ছন্দ।তবে সংস্কৃতে ‘মাত্রা’ বলতে যা বোঝায়, তা বাংলা মুক্ত ও রুদ্ধদলের ক্ষেত্রে হুবহু খাটে না। তাই প্রবোধচন্দ্র সেন মাত্রার বাংলা পরিভাষা হিসেবে ‘কলা’ শব্দটিকে গ্রহণ করেন। যে ছন্দে প্রতিটি দলের কলা বা মাত্রার হিসাব সূক্ষ্মভাবে মানা হয় (মুক্তদল = ১ কলা, রুদ্ধদল = ২ কলা), তাকে তিনি ‘কলাবৃত্ত ছন্দ’নাম দেন। আসলে এই ছন্দটি- 

      ধ্বনি ঝংকারময়, মধ্যম লয়ের এবং সুরপ্রধান ছন্দ। যার অন্যতম উদাহরণ-"কখনও একা কখনও জনসমাসে / জীবন বহে যায়।"

       ৩) মিশ্র কলাবৃত্ত ছন্দঃযার আগের নাম- অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, যৌগিক ছন্দ, তানপ্রধান ছন্দ। যে ছন্দে কলাবৃত্তের নিয়ম এবং দলবৃত্তের চালের এক ধরণের মিশ্রণ ঘটে (অর্থাৎ মুক্তদল সর্বদা ১ কলা এবং রুদ্ধদল চরণের মাঝে থাকলে ১ কলা কিন্তু শেষে থাকলে ২ কলা হিসেবে গণ্য হয়), প্রবোধচন্দ্র সেন তার নামকরণ করেন ‘মিশ্র কলাবৃত্ত ছন্দ’।আসলে-

        এটি ধীর লয়ের, গম্ভীর ভাব প্রকাশের উপযোগী ও পয়ার-ভিত্তিক ছন্দ।উদাহরণ-"মহাভারতের কথা অমৃত সমান / কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।"

     •ছন্দতত্ত্বের ইতিহাসে প্রবোধচন্দ্র সেনের অন্যান্য অবদানে আমরা দেখি তিনি 'দল' ও 'কলা' ধারণার প্রবর্তন করেন।আসলে বাংলা ছন্দের পরিভাষা গঠনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। যেখানে তিনি-‘দল’(মুক্তদল ও রুদ্ধদল) এবং ‘কলা’ পরিভাষাটি প্রয়োগ করে তিনি ছন্দ বিশ্লেষণকে অত্যন্ত সহজ ও নিখুঁত করে তোলেন।তাই তিনি-

    • বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি লাভ করেন।প্রবোধচন্দ্র সেনের এই ছন্দতাত্ত্বিক শ্রেণীকরণ ও নামকরণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মেনে নিয়েছিলেন এবং সানন্দে প্রশংসা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ছন্দ বিষয়ক বহু আলোচনার প্রেরণা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিলেন প্রবোধচন্দ্র সেন।

    •ছন্দবিষয়ক কালজয়ী গ্রন্থসমূহঃবাংলা ছন্দতত্ত্বকে এক সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় মর্যাদা দিতে তিনি বেশ কিছু আকর গ্রন্থ রচনা করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-‘বাংলা ছন্দের মূলসূত্র’ (১৯৩২),‘ছন্দ পরিক্রমা’ (১৯৬৫),‘ছন্দ গুরু রবীন্দ্রনাথ’ প্রভৃতি।

      বাংলা ছন্দবিজ্ঞান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ যদি হন বাংলা ছন্দের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার বা শিল্পী, তবে প্রবোধচন্দ্র সেন হলেন সেই ছন্দের সুনির্দিষ্ট স্থপতি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষক। দলবৃত্ত, কলাবৃত্ত ও মিশ্র কলাবৃত্ত-এই ত্রিবিধ নামকরণের মাধ্যমেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ছন্দ-আলোচনার ভিত্তিশিলা স্থাপিত হয়েছে। আজও বাংলা ভাষার যেকোনো আধুনিক ছন্দ গবেষণায় প্রবোধচন্দ্র সেনের প্রদত্ত পরিভাষা ও নীতিকেই প্রামাণ্য বলে গণ্য করা হয়।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...