Skip to main content

আর্যদের আদি বাসস্থান নির্ধারণ সংক্রান্ত সমস্যাটি পর্যালোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার, ইতিহাস মাইনর।

        আলোচনা শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও জটিল সামাজিক-সংস্কৃতি আলোচনাগুলির মধ্যে অন্যতম হলো 'আর্য সমস্যা' তথা আর্যদের আদি বাসস্থান নির্ধারণের প্রশ্ন।আসলে 'আর্য' শব্দটি মূলত কোনো নির্দিষ্ট বংশবাচক শব্দ নয়, বরং এটি একটি ভাষাগত গোষ্ঠী । উনিশ শতকে ফিলোলজি বা তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের প্রসারের পর পণ্ডিতদের মধ্যে এই প্রশ্ন তীব্র হয়ে ওঠে যে-এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার বক্তারা প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের কোন অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন?

ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ভাষাবিজ্ঞানীরা প্রধানত ৩টি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সমস্যা পর্যালোচনা করেছেন:

 1. ইউরোপীয় মতবাদ

 2. ভারতীয় মতবাদ

 3. মধ্য এশিয়া বা স্টেপ অঞ্চলীয় মতবাদ

## আর্যদের আদি বাসস্থান সংক্রান্ত প্রধান মতবাদসমূহ

### ১. ইউরোপীয় মতবাদ (European Theory)

তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের আবিষ্কারক **স্যার উইলিয়াম জোন্স** (Sir William Jones) ১৭৮৬ সালে সংস্কৃতির সঙ্গে ল্যাটিন, গ্রিক, ফার্সি এবং গথিক ভাষার নিবিড় সাদৃশ্যের কথা তুলে ধরেন। এরপর একাধিক ইউরোপীয় পণ্ডিত দাবি করেন যে আর্যদের মূল বাসস্থান ছিল ইউরোপে।

 * **হাঙ্গেরি ও দানিউব নদীর অববাহিকা:** ঐতিহাসিক **পি. গাইলস** (P. Giles) উদ্ভিদ ও প্রাণীর নামানুসারে (যেমন: ওক, বিচ গাছ এবং ঘোড়া, গরু) দাবি করেন যে, মধ্য ইউরোপের ডানিউব নদীর সমভূমি ও হাঙ্গেরি অঞ্চলই ছিল আর্যদের মূল বাসস্থান।

 * **জার্মানি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া:** জার্মানির প্রত্নতাত্ত্বিক **পেনকা** (Penka) এবং **শ্রাডার** (Schrader) শারীরিক গঠন ও নরগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উত্তর ইউরোপকে আদি বাসস্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

> **সমালোচনা:** এই মতবাদে ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তি কিছুটা জোরালো হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের অভাব রয়েছে। তাছাড়া ইউরোপের আবহাওয়ার সঙ্গে ঋগ্বেদে বর্ণিত ভৌগোলিক পরিবেশের বৈষম্য রয়েছে।

### ২. ভারতীয় মতবাদ (Indigenous Indian Theory)

একদল ভারতীয় পণ্ডিত ও জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ মনে করেন যে আর্যরা কোনো বহিরাগত গোষ্ঠী নয়, তারা ভারতবর্ষের সপ্তসিন্ধু অঞ্চলেরই মূল অধিবাসী ছিল।

 * **সপ্তসিন্ধু অঞ্চল:** প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ **ড. অবিনাশচন্দ্র দাস** (A.C. Das) এবং ড. সম্পূর্ণানন্দ মনে করেন, ঋগ্বেদে উল্লিখিত **'সপ্তসিন্ধু'** (সিন্ধু ও তার উপনদীসমূহ এবং সরস্বতী নদী সংলগ্ন অঞ্চল) ছিল আর্যদের মূল বাসস্থান।

 * **আর্কটিক অঞ্চল:** **বাল গঙ্গাধর তিলক** তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ *'The Arctic Home in the Vedas'* -এ ঋগ্বেদের দীর্ঘ দিন ও রাতের বর্ণনার ভিত্তিতে দাবি করেন যে, আর্যদের আদি স্থান ছিল উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চল।

 * **তিব্বত অঞ্চল:** **স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী** তাঁর *'সত্যার্থ প্রকাশ'* গ্রন্থে বৈদিক সাহিত্যের তথ্যের ভিত্তিতে তিব্বতকে আদি বাসস্থান বলে উল্লেখ করেন।

> **সমালোচনা:** আধুনিক ইতিহাসবিদ ও জিনবিজ্ঞানীদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার সময়কালের নগরসংস্কৃতির সাথে বৈদিক আর্যদের গ্রামকেন্দ্রিক ও পশু পালনভিত্তিক সংস্কৃতির মৌলিক পার্থক্য ছিল। এছাড়া ঋগ্বেদে উল্লেখিত ঘোড়ার ব্যবহারের মতো তথ্য প্রাক-বৈদিক ভারতে মেলে না।

### ৩. মধ্য এশিয়া ও ইউরেশীয় স্টেপ মতবাদ (Central Asian & Steppe Theory)

বর্তমানে অধিকাংশ আধুনিক ইতিহাসবিদ, ভাষাবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক যে মতবাদটিকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন, তা হলো **মধ্য এশিয়া বা ইউরেশীয় স্টেপ অঞ্চলের মতবাদ**।

```

ইউরেশীয় স্টেপ অঞ্চল (কাস্পিয়ান সাগরের উত্তর) 

          │

          ├──► দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া (ইরান) ──► ভারত (সপ্তসিন্ধু)

          │

          └──► ইউরোপ মহাদেশ


```

 * **ম্যাক্স মুলার (Max Müller):** জার্মান ভাষাবিদ ম্যাক্স মুলার যুক্তি দেন যে, আর্যরা মূলত পশুপালক ছিল এবং তাদের প্রধান জীবিকা ও যানবাহনের মাধ্যম ছিল ঘোড়া। মধ্য এশিয়ার কাস্পিয়ান সাগর ও কির্ঘিজ স্টেপ অঞ্চলে এই পরিবেশ বিদ্যমান ছিল।

 * **কুর্গান তত্ত্ব (Kurgan Hypothesis):** প্রত্নতাত্ত্বিক **মারিজা গিমবুতাস** (Marija Gimbutas) এবং **গর্ডন চাইল্ড** (Gordon Childe) দেখান যে, দক্ষিণ রাশিয়া ও কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরে অবস্থিত 'কুর্গান সংস্কৃতি' বা 'আন্দ্রোনোভো সংস্কৃতি'-র অধিবাসীরাই ছিল আদি ইন্দো-ইউরোপীয় সম্প্রদায়।

## প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ

এই সমস্যার সমাধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বিশেষভাবে সাহায্য করে:

 1. **বোগাজকই শিলালিপি (Boghazköi Inscription, ১৩৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ):** এশিয়া মাইনর বা বর্তমান তুরস্ক থেকে প্রাপ্ত এই চুক্তিপত্রে বৈদিক দেবতা **ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও নাসত্য (অশ্বিনীকুমারদ্বয়)**-এর নাম পাওয়া যায়। এটি প্রমাণ করে যে আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে আসার পথে এশিয়া মাইনরে অবস্থান করেছিল।

 2. **কাসাইট ও মিতান্নি শিলালিপি:** মেসোপটেমিয়ার এই শিলালিপিগুলোতেও ভারতীয় আর্যদের নাম ও সংস্কৃতির ছাপ মেলে।

 3. **ঋগ্বেদ ও জেন্দ আবেস্তা:** পারসিক ধর্মগ্রন্থ *'জেন্দ আবেস্তা'* এবং ভারতের *'ঋগ্বেদ'* -এর ভাষা, সামাজিক নিয়মাবলী ও ধর্মীয় ধারণার মধ্যে গভীর মিল রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে ভারতীয় ও ইরানি আর্যরা দীর্ঘকাল একসঙ্গে মধ্য এশিয়া বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাস করত।

## মূল্যায়ন ও আধুনিক সিদ্ধান্ত

সাম্প্রতিক **জিনগত গবেষণা (Genetic & DNA Studies)** এবং প্রত্নপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদগণ (যেমন— রোমিলা থাপার, রামশরণ শর্মা প্রমুখ) এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে:

 * আর্যরা কোনো একক সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে ভারতের মূল অধিবাসীদের ধ্বংস করেনি।

 * খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে মধ্য এশিয়ার স্টেপ অঞ্চল থেকে কয়েক দফায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারা ভারতে **অভিবাসন** (Migration) করেছিল।

## উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আর্যদের আদি বাসস্থান নির্ধারণ সংক্রান্ত বিতর্কের অবসান ঘটাতে বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সাথে জিনতত্ত্বের সংমিশ্রণ ঘটানো হচ্ছে। যদিও বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের কথা বলেছেন, তবুও **দক্ষিণ রাশিয়া বা কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরাঞ্চলীয় মধ্য এশীয় স্টেপ অঞ্চলকেই** আর্যদের আদি বাসস্থান হিসেবে ধরা এবং সেখান থেকেই তাদের ভারতে আগমন ঘটেছিল বলে স্বীকার করে নেওয়া সর্বাধুনিক ও সর্বাপেক্ষা যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...