"সাহিত্যই মানব হৃদয়ে সেই ধ্রুব অসীমের বিকাশ"—উক্তিটির তাৎপর্য বিচার করো।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধাবলীতে সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য ও রূপ আলোচনা করতে গিয়ে নন্দনতাত্ত্বিক এই সত্যটি তুলে ধরেছেন। সাহিত্য কেবল ক্ষণস্থায়ী রূপের বা দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা নয়; তা মানুষের অন্তরের চিরন্তন ও অসীম আকাঙ্ক্ষার সৌন্দর্যময় প্রকাশ। সাহিত্য নন্দনতত্ত্বের বিচারে উক্তিটি অত্যন্ত অর্থবহ ও যথার্থ।আর সেখানে-
•সসীম ও অসীমের মিলন।মানুষের পার্থিব জীবন স্থান, কাল ও শরীরের সীমানায় আবদ্ধ। কিন্তু মানুষের মন বা আত্মা এই ক্ষণস্থায়ী সীমানায় বন্দি থাকতে চায় না। মানুষের মধ্যে রয়েছে এক পরম অসীমকে অনুভব করার ব্যাকুলতা। বৈষয়িক জগৎ যেখানে মানুষকে সীমাবদ্ধ করে, সাহিত্য সেখানেই অসীমের জানলা খুলে দেয়। রূপের জগতে দাঁড়িয়ে অরূপকে স্পর্শ করাই সাহিত্যের মূল লক্ষ্য।
•ব্যক্তিসত্তা থেকে বিশ্বজনীনতা।সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনাই যখন সাহিত্যের রূপ নেয়, তখন তা আর কোনো একক ব্যক্তির থাকে না; তা সর্বজনীন মানবহৃদয়ের অনুভূতিতে পরিণত হয়। রামায়ণের ক্রৌঞ্চবধের শোক যেমন বিশ্বসাহিত্যে চিরন্তন কাব্যের রূপ পেয়েছিল, তেমনি মানুষের অন্তরের ধ্রুব প্রেম, বেদনা ও আনন্দ সাহিত্যের মাধ্যমে অনন্তকালের মানবহৃদয়ে বিকশিত হয়।
•ধ্রুব বা শাশ্বত রসের প্রকাশ। জাগতিক বস্তু বা ঘটনা পরিবর্তনশীল হলেও মানুষের হৃদয়ের মূল ভাবসমূহ (যেমন—প্রেম, শোক, আনন্দ, বিস্ময়) চিরন্তন বা 'ধ্রুব'। সাহিত্য এই ধ্রুব অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়ে ক্ষণকালকে অনন্তকালে এবং সসীমকে অসীমে উন্নীত করে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, সাহিত্য হলো সসীমের বাঁধন ভেঙে অসীমের পানে মানবহৃদয়ের যাত্রা। ভাষা ও সৌন্দর্যের রূপান্তরের মাধ্যমে সাহিত্য মানুষের ভিতরের সেই পরম, শাশ্বত ও "ধ্রুব অসীম"-কে বিকশিত করে তোলে। তাই মন্তব্যটি নন্দনতাত্ত্বিক ও সাহিত্য-দর্শনের বিচারে অত্যন্ত সঙ্গত ও সার্বজনীন।
Comments
Post a Comment