শাক্ত পদাবলীতে ‘আগমনী’ ও ‘বিজয়া’ পর্যায় বলতে কী বোঝায়? সংক্ষেপে লেখো।
পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
প্লিজ এই উত্তরটি তথ্যমূলক ভাবে দেবেন যা ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় ভীষণ কাজে লাগবে।
বাংলা বৈষ্ণব ও শাক্ত সাহিত্যের একটি অন্যতম উজ্জ্বল রত্ন হলো **শাক্ত পদাবলী**। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ সাধক কবিদের হাত ধরে এই সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটে। শাক্ত পদাবলীর অন্যতম জনপ্রিয় ও রসোত্তীর্ণ পর্যায় হলো **আগমনী** ও **বিজয়া**।
পরীক্ষার উত্তরপত্র রচনার সুবিধার জন্য নিচে তথ্যমূলকভাবে পর্যায় দুটি আলোচনা করা হলো:
## ১. আগমনী পর্যায়
**‘আগমনী’** শব্দের অর্থ আগমন বা ঘরে আসা। হিন্দু পৌরাণিক ঐতিহ্য ও বাঙালি সমাজজীবনের মেলবন্ধনে রচিত এই পদগুলোতে দেবদেবী কিংবা অলৌকিকতার চেয়ে একজন বাঙালি গৃহস্থ ঘরের মা ও মেয়ের স্নেহ-ভালোবাসার ব্যাকুলতা প্রাধান্য পেয়েছে।
* **বিষয়বস্তু:** গিরিরাজ হিমালয় ও রানী মেনকার কন্যা **উমা (পার্বতী)**। কড়া তপস্যা করে তিনি রুদ্র রূপধারী শ্মশানবাসী **শিবের** সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কৈলাসে চলে যান। বছরে মাত্র একবার শরৎকালে তিন দিনের (সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী) জন্য উমা বাপের বাড়ি (মর্ত্যে) আসার সুযোগ পান।
* **আবেগ ও সুর:** উমার বাপের বাড়ি আসার পূর্ব মুহূর্তে মা মেনকার ব্যাকুলতা, দুঃস্বপ্ন দেখা, স্বামী হিমালয়ের কাছে মেয়েকে ফিরিয়ে আনার জন্য সাকুত আকুতি—এসবই আগমনী পর্বের মূল উপজীব্য। উমা বাপের বাড়ি আসার পর মা-মেয়ের মিলন এবং আনন্দের সুর এতে ধ্বনিত হয়।
* **সামাজিক তাৎপর্য:** তৎকালীন বাঙালি সমাজে বালিকাবধূকে দূরে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার পর মায়ের যে চিরন্তন করুণ বেদনা, আগমনী পদে দেবী উমার মাধ্যমে সেই সাধারণ বাঙালি মায়ের মাতৃহৃদয়ের ছবি ফুটে উঠেছে।
## ২. বিজয়া পর্যায়
**‘বিজয়া’** পর্যায় হলো আগমনী পর্বের ঠিক বিপরীত এবং এক বিরহ-বিধুর করুণ অধ্যায়। 'বিজয়া' বলতে দশমীর দিন উমার কৈলাসে বা শ্বশুরবাড়িতে প্রত্যাবর্তনকে বোঝানো হয়েছে।
* **বিষয়বস্তু:** তিন দিনের আনন্দ পর্ব শেষ হতেই নবমীর রাত পোহালে আসে বিজয়া দশমী। এবার উমাকে আবার ফিরে যেতে হবে পতিগৃহ কৈলাসে।
* **আবেগ ও সুর:** উমার বিদায়বেলায় মা মেনকার হৃদয়বিদারক আর্তনাদ, উমাকে আঁকড়ে ধরে রাখার ব্যাকুল চেষ্টা এবং বিদায়ের তীব্র যন্ত্রণা এই পর্যায়ের মূল সুর। মা মেনকার আকুল মিনতি—*“রজনী পোহাইও না”* (অর্থাৎ নবমীর রাত যেন আর না শেষ হয়)।
* **সামাজিক তাৎপর্য:** এটি কেবল কোনো দেবীর বিদায় নয়, বরং এক বাপের বাড়ির কন্যাকে অশ্রুসজল চোখে শ্বশুরবাড়িতে বিদায় জানানোর অত্যন্ত করুণ সামাজিক সত্যের প্রতিফলন।
## সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ (Quick Exam Notes)
| বৈশিষ্ট্য | আগমনী | বিজয়া |
| :--- | :--- | :--- |
| **মূল অর্থ** | উমার বাপের বাড়িতে আগমন | উমার শ্বশুরবাড়িতে (কৈলাসে) প্রত্যাবর্তন |
| **সময়কাল** | ষষ্ঠী থেকে নবমীর সূচনা | নবমীর শেষ রাত থেকে দশমী |
| **মূল রস/সুর** | বাৎসল্য রস, আশা ও মিলনের আনন্দ | করুণ রস, বিরহ ও বিচ্ছেদের বেদনা |
| **প্রধান চরিত্র** | মেনকা, উমা ও হিমালয় | মেনকা, উমা ও হিমালয় |
### পরীক্ষার্থী বন্ধুদের জন্য বিশেষ টিপস:
> **স্মরণীয় পদকর্তা:** রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, দাশরথি রায় (দাশু রায়), রূপচাঁদ পক্ষী প্রমুখ কবিগণ আগমনী ও বিজয়া পদে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
> **উপসংহার কথা:** কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আগমনী-বিজয়া সম্পর্কে যথার্থই বলেছিলেন—এ পদগুলো আসলে **“বাঙালির ঘরের কথা”**। আগমনী ও বিজয়ার মাধ্যমে পৌরাণিক দেব-দেবী এক লৌকিক বাঙালি পরিবারে রূপান্তরিত হয়েছেন।
>
Comments
Post a Comment