সমাজতত্ত্বের ব্যবহারিক গুরুত্ব (Practical Importance of Sociology) আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার সমাজবিদ্যা মাইনর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, মানব সমাজের এক সামগ্রিক চিত্র পাওয়ার জন্য একটি সাধারণ শাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা আছে। যেখানে এই সামগ্রিক ও সাধারণ স্বাস্থ্যটি প্রধান কাজ হবে অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের আলোচনা ও ফলাফলকে একত্রিত বা সমন্বিত করা। আর সমাজবিজ্ঞান হলো সেই সাধারণ শাস্ত্র, যা সামাজিক জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ দিকগুলি এবং তার প্রাসঙ্গিক নিয়মনীতিগুলি সম্পর্কে অনুসন্ধান করে এবং বিশেষ সমাজবিজ্ঞানগুলির মধ্যে সংহতি বা সমন্বয় সাধন করে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে সমাজতত্ত্বের যে ব্যবহারিক গুরুত্ব গুলি আমরা পাই সেগুলি হলো -
১) অধ্যাপক হবহাউস তার 'সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট' নামক গ্রন্থে বলেন যে- সমাজতত্ত্ব অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত নানা বিষয় বা মানবিক বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে সহায়ক উপাদান সংগ্রহ করে দেয়।এমনও দেখা গেছে যে, সমাজবিজ্ঞানের বিশেষীকৃত একটি শাখা যখন কোনো বিষয় বা তত্ত্ব বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেক্ষেত্রে সমাজতত্ত্বের বিশেষ ব্যাখ্যা সেই অসমাপ্ত বিষয়কে সম্পূর্ণ করেছে।
২)আধুনিক সমাজে দারিদ্র্য, অপরাধ, বেকারত্ব, শিশুশ্রম, নারী নির্যাতন, পারিবারিক ভাঙন বা মাদকাসক্তির মতো নানা সমস্যা দেখা যায়। সমাজতত্ত্ব কেবল এই সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে না, বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সমস্যাগুলির মূল কারণ অনুসন্ধান করে এবং তা সমাধানের ব্যবহারিক পথ দেখায়।
৩)যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকার যখন কোনো উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বা জনকল্যাণমূলক নীতি (যেমন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান বা নারী ক্ষমতায়ন সম্পর্কিত নীতি) গ্রহণ করে, তখন সমাজতাত্ত্বিক তথ্যের প্রয়োজন হয়। সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা ছাড়া সঠিক নীতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
৪)সমাজ সর্বদা পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তির প্রসার, বিশ্বায়ন ও নগরায়নের ফলে সমাজে কীভাবে পরিবর্তন আসছে এবং সেই পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে—তা বুঝতে সমাজতত্ত্ব সাহায্য করে। সমাজে কুসংস্কার দূর করে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে এটি বিশেষ ভূমিকা নেয়।
৫)সমাজতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো 'অপরাধবিজ্ঞান'। সমাজতত্ত্ব মানুষকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে অপরাধের পেছনের সামাজিক কারণ খুঁজে বের করার ওপর জোর দেয়। ফলে অপরাধীকে সংশোধন করে সমাজে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞান কাজে লাগে।
৬)একটি বহুজাতিক বা বহুসংস্কৃতির দেশে (যেমন ભારત) বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে বাস করে। সমাজতত্ত্ব ভিন্ন সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর জীবনধারা বুঝতে সাহায্য করে, যা সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা, সম্প্রীতি ও সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে।
৭) বর্তমান যুগে প্রশাসনিক কাজ, সমাজকল্যাণমূলক কাজ, জনসংযোগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গণমাধ্যমের মতো পেশায় সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞানের চাহিদা ব্যাপক। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সমাজতত্ত্বের জ্ঞান ব্যবহার করে জনগণের সমস্যা সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
৮) সমাজতত্ত্ব পাঠের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে 'সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি' গড়ে ওঠে। এটি একজন মানুষকে কেবল একজন সচেতন ব্যক্তি নয়, বরং সমাজের একজন দায়িত্বশীল ও সহানুভুতিশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সমাজতত্ত্ব কেবল শ্রেণীকক্ষে আলোচনার কোনো শুষ্ক তত্ত্ব নয়। সামাজিক ব্যাধি নিরাময়, নীতি নির্ধারণ, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং একটি সুসংহত ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে সমাজতত্ত্বের ব্যবহারিক গুরুত্ব আধুনিক বিশ্বে অনস্বীকার্য সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। কারণ সমস্তত্বেরও একটি সীমিত বিশেষ দিক আছে, যে দিকটি হল অন্যান্য বিশেষীকৃত সামাজিক বিজ্ঞান থেকে আলাদা ক্ষেত্র।
Comments
Post a Comment