বৈশেষিক দর্শন।।বৈশেষিক দর্শনে কয়টি পদার্থ স্বীকার করে?সেই পদার্থের ক্রমটি সাজাও এবং এই ক্রমটির কারণ কী? কেন এমন ক্রম করা হয়েছে?
বৈশেষিক দর্শন।।বৈশেষিক দর্শনে কয়টি পদার্থ স্বীকার করে?সেই পদার্থের ক্রমটি সাজাও এবং এই ক্রমটির কারণ কী? কেন এমন ক্রম করা হয়েছে? পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।।
•পদার্থঃ বৈশেষিক দর্শন অনুযায়ী,"পদার্থ" শব্দের অর্থ হলো "পদের অর্থ"-অর্থাৎ, যে বস্তুকে বা ধারণাকে শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত বা প্রকাশ করা যায়, তাকেই পদার্থ বলে।অর্থাৎ যা জ্ঞানের বিষয় এবং যাকে নাম দেওয়া সম্ভব, তা-ই পদার্থ।
মহর্ষি কণাদ প্রণীত বৈশেষিক সূত্রে পদার্থের লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে-"জ্ঞেয়ত্বং অভিধেয়ত্বং পদার্থত্বম্"। অর্থাৎ, পদার্থ হওয়ার জন্য তিনটি মূল বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক। আর সেই বৈশিষ্ট্যগুলি হলো-
•জ্ঞেয়ত্বঃ যা জানা যায় বা জ্ঞানের বিষয় হয়।
•অভিধেয়ত্বঃ যাকে কোনো নাম বা শব্দ দিয়ে প্রকাশ বা উচ্চারণ করা যায়।
•অস্তিত্বঃ যা জগতে কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান।
•• বৈশেষিক দর্শন অনুসারে পদার্থের বিভাগঃবৈশেষিক দর্শনে জগত সংসারের সমস্ত জ্ঞেয় বিষয়কে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আর সেই ভাগগুলি হলো-
১) ভাব পদার্থঃ যা বিদ্যমান বা সদ্বস্তু। এই পদার্থ মোট ৬টি।
২) অভাব পদার্থঃ যা কোনো কিছুর অনুপস্থিতি নির্দেশ করে। ১টি।
তবে পরবর্তীকালে আচার্য শিবাদিত্য তাঁর 'সপ্তপদার্থী' গ্রন্থে ভাব ও অভাব মিলিয়ে মোট ৭টি পদার্থ স্বীকার করেছেন। সুতরাং, বৈশেষিক দর্শনে মোট ৭টি পদার্থ স্বীকার করা হয়।সেই পদার্থের সঠিক ক্রমগুলি নিম্নরূপ-
1.দ্রব্য। 2. গুণ। 3.কর্ম। 4.সামান্য। 5.বিশেষ। 6.সমবায়।7.অভাব
••• এই নির্দিষ্ট ক্রমটির কারণ ও যুক্তিঃবৈশেষিক দর্শনে পদার্থের এই ক্রমটি কেবল এলোমেলো নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর যৌক্তিক, কার্যকারণগত এবং সত্তাতাত্ত্বিক (Ontological) কারণ। নিচে এই ক্রমটির যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করা হলো-
১.'দ্রব্য' সর্বপ্রথমে কেন? দ্রব্য হলো অন্যান্য সমস্ত ভাব পদার্থের (গুণ, কর্ম ইত্যাদি) মূল আশ্রয় বা আধার। গুণ বা কর্ম কখনো আশ্রয় ছাড়া একা অবস্থান করতে পারে না; তারা দ্রব্যের ওপর নির্ভর করে থাকে (যেমন-'সাদা' একটি গুণ, যা 'দুধ' বা 'কাগজ' নামক দ্রব্যে থাকে)। কিন্তু দ্রব্য গুণ বা কর্ম ছাড়াও সূচনার মুহূর্তে স্বতন্ত্রভাবে অবস্থান করতে পারে। তাই যা মূল আশ্রয়, তাকে সবার প্রথমে রাখা হয়েছে।
২.'গুণ' দ্বিতীয় স্থানে কেন?দ্রব্যের নিত্য সঙ্গী হলো গুণ। দ্রব্য উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তার নিজস্ব গুণ প্রকাশিত হয়।যেখানে কর্মের (গতির) তুলনায় গুণ অধিক স্থায়ী।একটি বস্তুর গুণ তার মধ্যে স্থির থাকে, কিন্তু কর্ম বা ক্রিয়া ক্ষণস্থায়ী। তাই গুণের স্থায়িত্ব বেশি হওয়ায় কর্মের আগেই গুণের স্থান।
৩.'কর্ম' তৃতীয় স্থানে কেন? গুণ এবং কর্ম-উভয়েই দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গুণ হলো স্থিতিপ্রদ বা নিশ্চল, আর কর্ম হলো গতিশীল বা পরিবর্তনশীল (যেমন-উৎক্ষেপণ, অবক্ষেপণ ইত্যাদি)।আসলে বস্তুর স্থির রূপ (গুণ) অনুভবের পরেই তার গতি বা ক্রিয়া (কর্ম) লক্ষ্য করা যায়, তাই কর্মকে গুণের পরে রাখা হয়েছে।
৪.'সামান্য' চতুর্থ স্থানে কেন? দ্রব্য, গুণ ও কর্ম পর্যবেক্ষণের পর এদের মধ্যে একটি সাধারণ ধর্ম বা জাতি দেখতে পাওয়া যায় (যেমন-সব মানুষের মধ্যে 'মনুষ্যত্ব', সব লাল বস্তুর মধ্যে 'রক্তিমতা')। আসলে এখানে প্রথম তিনটি পদার্থের মধ্যে সাধারণ সমতা বা একতা অনুভবের জন্য 'সামান্য'-এর ধারণা প্রয়োজন হয়।
৫. 'বিশেষ' পঞ্চম স্থানে কেন? দুটি নিত্য দ্রব্য (যেমন দুটি পরমাণু) যখন দেখতে বা গুণে হুবহু এক হয়, তখন তাদের একটিকে অন্যটি থেকে পৃথক করার জন্য 'বিশেষ' নামক পদার্থের প্রয়োজন হয়। 'সামান্য' আমাদের বস্তুর মধ্যে ঐক্য বা মিল দেখায়, আর 'বিশেষ' দেখায় পার্থক্য।তাই সামান্যের ধারণার পরপরই তার বিপরীত ধর্মী 'বিশেষ'-কে রাখা হয়েছে।
৬.'সমবায়' ষষ্ঠ স্থানে কেন? দ্রব্য-গুণ, দ্রব্য-কর্ম, কিংবা সামান্য-ব্যক্তির মধ্যে যে নিত্য ও অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ বিদ্যমান, তা বোঝাতেই 'সমবায়' স্বীকার করা হয়।প্রথম পাঁচটি পদার্থ কীভাবে একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত থাকে, তা ব্যাখ্যার জন্যই ষষ্ঠ স্থানে 'সমবায়'-কে আনা হয়েছে।
৭.'অভাব' সর্বশেষে কেন?প্রথম ৬টি পদার্থ হলো ‘ভাব পদার্থ’ (যাদের ইতিবাচক সত্তা রয়েছে)। কিন্তু ‘অভাব’ হলো ‘অভাবাত্মক বা নেতিবাচক পদার্থ’।তবে এখানে-
অভাবকে বুঝতে হলে আগে যার অভাব (প্রতিযোগী বস্তু) তা জানতে হয় (যেমন-'ঘটের অভাব' বুঝতে হলে আগে 'ঘট' বা কলসি কী তা জানা জরুরি)। তাই সমস্ত ইতিবাচক বা ভাব পদার্থের আলোচনার পরেই সর্বশেষে অভাবকে স্থান দেওয়া হয়েছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment