শাক্ত পদাবলী।। ‘ওহে নবমী-নিশি, না হইও রে অবসান’ — পংক্তিটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এর অন্তর্নিহিত ভাব সৌন্দর্য ও কাব্যিক তাৎপর্য আলোচনা করো।
শাক্ত পদাবলী।। ‘ওহে নবমী-নিশি, না হইও রে অবসান’ — পংক্তিটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এর অন্তর্নিহিত ভাব সৌন্দর্য ও কাব্যিক তাৎপর্য আলোচনা করো।
°উদ্ধৃত পদ্যাংশটি শাক্ত পদাবলীর অন্যতম প্রধান সাধক কবি কমলাকান্ত ভট্টাচার্য রচিত বিজয়া পর্যায়ের এক কালজয়ী পদ থেকে গৃহীত।
বাংলা সাহিত্যের শাক্ত পদাবলীতে পৌরাণিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে যে লৌকিক ও সামাজিক চিত্র ফুটে উঠেছে, তার একটি করুণ ও রসঘন প্রকাশ ঘটেছে এই পংক্তিটিতে। শরৎকালের দুর্গাপূজার তিন দিন বাপের বাড়িতে কাটানোর পর দশমীর প্রাতে উমাকে আবার স্বামী শিবের গৃহ কৈলাসে ফিরে যেতে হবে। নবমীর রাত শেষ হওয়া মানেই বিদায়ের বার্তা। তাই উমার মা মেনকা ব্যাকুল হৃদয়ে নবমীর রাত বা ‘নবমী-নিশি’র কাছে অনুনয় করছেন যেন সেই রাত আর শেষ না হয়।
•ভাব সৌন্দর্য ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য•
১)সময়কে থমকে দেওয়ার আকুতি। বাস্তব জীবনে সময় অপ্রতিরোধ্য, তাকে থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু বাৎসল্য রসে অন্ধ মা মেনকা প্রাকৃতিক নিয়মকে অস্বীকার করে নবমী-নিশিকে থমকে দাঁড়াতে অনুরোধ করছেন। মায়ের যুক্তি হলো—রাত শেষ না হলে সকাল হবে না, আর সকাল না হলে উমাকেও শ্বশুরবাড়িতে বিদায় দিতে হবে না। মায়ের এই অসম্ভব ইচ্ছা প্রকৃতপক্ষে সন্তান বিচ্ছেদের ভয়ে কাতর এক চিরন্তন মাতৃহৃদয়ের অসহায়তাকে প্রকাশ করে।
২)দেবত্বের লৌকিকীকরণ ও বাৎসল্য রস।এখানে দেবী উমা বা পার্বতী কেবল কোনো অলৌকিক শক্তি নন, তিনি বঙ্গগৃহের এক বালিকাবধূ। আর মেনকা হলেন এক সাধারণ বাঙালি মা। শাক্ত কবিরা পৌরাণিক দেব-দেবীকে বাঙালির ঘরে এনে সাধারণ সমাজচিত্র এঁকেছেন। বিদায়বেলায় মায়ের বুদ্বুদসম কান্না ও হাহাকার এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে, যা পদটিকে করুণ ও বাৎসল্য রসে সিক্ত করেছে।
৩)সামাজিক সত্যের প্রতিফলন।তৎকালীন বঙ্গসমাজে বালিকাবধূকে দূরদেশে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার পর মায়েরা সারাবছর অপেক্ষা করতেন। উমার মধ্য দিয়ে তৎকালের সমস্ত বাঙালি কন্যার এবং মেনকার মধ্য দিয়ে চিরন্তন বাঙালি মায়ের বিরহবেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছে।
পরিশেষে বলা যায় যে,বাস্তব ও কল্পনার মেলবন্ধনে কবির এই পদটি কেবল দেবীর বিদায়গাথা নয়, এটি সর্বকালের মাতৃহৃদয়ের শাশ্বত আকুলতার এক অপূর্ব দলিল। তাই বিজয়া পর্যায়ের কবি-কৃতিত্ব বিচারে এবং মানবীয় অনুভূতির প্রকাশের দিক থেকে পংক্তিটি কালজয়ী মর্যাদা লাভ করেছে।
"গিরি, এবার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না।" বক্তা কে? কার উদ্দেশ্যে কথাটি বলা হয়েছে? উমাকে আর না পাঠানোর কারণ কী? (১+১+৩)
উদ্ধৃত অংশের বক্তা হলেন পর্বতের রাজা হিমালয়ের স্ত্রী মেনকা (বা গিরিরাণী)।আর এই কথাটি তাঁর স্বামী গিরিরাজ হিমালয়-এর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।আর সেখানে-
• উমাকে আর না পাঠানোর কারণ হলো-সনাতন হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী ও বাংলার আগমনী-বিজয়া গান অনুসারে, দেবী উমা (পার্বতী) হলেন গিরিরাজ ও মেনকার একমাত্র কন্যা। উমার বিয়ে হয়েছে কৈলাসের অধিপতি দেবাদিদেব শিবের সাথে।উমাকে আর শিবের ঘরে না পাঠানোর মূল কারণগুলো হলো-
মাতৃহৃদয়ের চরম আকুলতা ও বিচ্ছেদযন্ত্রণা।বছর জুড়ে মাত্র তিনটি দিনের (সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী) জন্য উমা বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসে। বিজয়া দশমীতে তাকে আবার স্বামীর ঘরে ফিরে যেতে হয়। উমা চলে গেলে মা মেনকার বুক ভেঙে যায় এবং দীর্ঘ বিচ্ছেদযন্ত্রণা সহ্য করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে।আর সেখানে আমরা দেখি-
শিবের সংসারী উদাসীনতা ও দৈন্যদশা।মেনকার মতে, জামাতা শিব মহাউদাসীন, শ্মশানবাসী এবং অত্যন্ত দরিদ্র। তিনি কন্যাহারা মায়ের কষ্টের কথা অনুধাবন করেন না বা বোঝেন না।
লোাকলজ্জা ও উমার দুঃখ।পাছে লোকজনে উমাকে নিয়ে কটূক্তি করে কিংবা কৈলাসের কষ্টকর পরিবেশে উমা শান্তিতে না থাকে-সেই মাতৃদুশ্চিন্তা থেকে মেনকা সিদ্ধান্ত নেন যে, উমা এবার বাপের বাড়িতে এলে তিনি আর তাকে স্বামীর ঘরে ফেরত পাঠাবেন না, নিজের কাছেই আগলে রাখবেন।
"প্রসাদ বলে, মনের আশা, মিছা আসায় যাবে ভেসে।" পদটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
রামপ্রসাদ সেনের এই পদে পৌরাণিক কাঠামোর চেয়ে বাঙালি ঘরের শাশ্বত মাতৃহৃদয়ের বাৎসল্য রস ও নির্মম সামাজিক বাস্তবতা প্রাধান্য পেয়েছে।
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী দেবী উমা বছরান্তে মাত্র তিন দিনের জন্য বাপের বাড়িতে আসেন। কিন্তু মা মেনকার ব্যাকুল মাতৃহৃদয় কন্যাকে চিরতরে নিজের কাছে আগলে রাখতে চায়। বিজয়া দশমীতে উমার পতিগৃহ কৈলাসে ফিরে যাওয়া সুনিশ্চিত জেনেও উমাকে আটকে রাখার যে আকুল বাসনা মা মেনকা প্রকাশ করেন, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার নির্মম নিয়মে অকার্যকর বা ‘মিছা আশা’য় পরিণত হয়।
১৮-১৯ শতকের বাংলায় বাল্যবিবাহের ফলে কন্যারা শ্বশুরবাড়িতে চলে যেত এবং মায়েরা বাপের বাড়িতে অল্প দিনের জন্য মেয়েকে কাছে পেতেন। বিদায়বেলায় বাঙালি মায়ের বুকফাটা হাহাকার ও পতিগৃহের কষ্ট থেকে মেয়েকে আগলে রাখার অসহায়ত্বকেই রামপ্রসাদ মেনকার জবানিতে রূপ দিয়েছেন।
এখানে স্বর্গীয় দেবী উমা হয়ে উঠেছেন এক সাধারণ বাঙালি মেয়ে আর মেনকা এক চিরন্তন বাঙালি মা। পৌরাণিক দেবত্বকে ছাপিয়ে পদটিতে শাশ্বত বাৎসল্য রস ও কন্যা-বিচ্ছেদের করুণ বাস্তবতাই মূল হয়ে উঠেছে।
Comments
Post a Comment