Skip to main content

 


আদি আদি বৈদিক যুগের সমাজ জীবন সম্পর্কে বর্ণনা করো।পরবর্তী বৈদিক যুগে তুমি কি ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করো- আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।








**প্রশ্ন: আদি বৈদিক যুগের সমাজ জীবনের বিবরণ দাও। পরবর্তী বৈদিক যুগে সামাজিক ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় আলোচনা করো।**

**মান: ১০ (৫+৫)**

**বিশ্ববিদ্যালয়: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় (WBSU) — প্রথম সেমিস্টার (ইতিহাস মাইনর)**

## উপক্রমণিকা

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে বৈদিক যুগ (আনুমানিক ১৫০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দীর্ঘ সময়সীমাকে ঋগ্বৈদিক বা **আদি বৈদিক যুগ** (১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এবং সাম, যজু, অথর্ববেদ ও ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যনির্ভর **পরবর্তী বৈদিক যুগ** (১০০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) — এই দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। লৌহ প্রযুক্তির আবিষ্কার, কৃষিতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রসার এবং গাঙ্গেয় উপত্যকায় জনবসতি গড়ে ওঠার ফলে ঋগ্বৈদিক আমলের সহজ-সরল সমাজ ব্যবস্থা পরবর্তী বৈদিক যুগে এক জটিল ও কঠোর রূপ পরিগ্রহ করে।

## প্রথম অংশ: আদি বৈদিক যুগের সমাজ জীবন

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডল ব্যতীত অপরাপর অংশ পর্যালোচনা করলে আদি বৈদিক সমাজের এক সহজ, গতিশীল ও পশুপালনকেন্দ্রিক উপজাতীয় কাঠামোর পরিচয় পাওয়া যায়।

### ১. পারিবারিক কাঠামো

 * **পিতৃতান্ত্রিক যৌথ পরিবার:** আদি বৈদিক সমাজ ছিল মূলত পিতৃতান্ত্রিক ও পিতৃকুলানুক্রমিক। সমাজের সর্বনিম্ন একক ছিল 'গৃহ' বা 'কুল' এবং পরিবারের প্রধানকে বলা হতো **'গৃহপতি'** বা **'কুলপ'**। পরিবারের সকল সদস্য তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকত।

### ২. বর্ণপ্রথা ও পেশাগত নমনীয়তা

 * **নমনীয় সমাজ ব্যবস্থা:** ঋগ্বৈদিক যুগে জন্মভিত্তিক বা কঠোর কোনো বর্ণপ্রথা ছিল না। সমাজ প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল— 'আর্য' এবং 'দাস/দস্যু'।

 * **কর্মভিত্তিক বিভাজন:** পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ছিল। ঋগ্বেদের এক বিখ্যাত মন্ত্রে এক কবি লিখেছেন— *"আমি একজন কবি, আমার পিতা চিকিৎসক এবং আমার মা নোড়া দিয়ে শস্য পিষছেন।"* ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের **'পুরুষসূক্ত'** নামক অংশেই প্রথম ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র— এই চার বর্ণের উল্লেখ মেলে, যা আদি বৈদিক যুগের শেষের দিকের সংযোজন।

### ৩. নারীদের সম্মানজনক স্থান

 * **শিক্ষা ও সামাজিক স্বাধীনতা:** ঋগ্বৈদিক সমাজে নারীরা যথেষ্ট উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। অপালা, ঘোষা, বিশ্বভারা, লোপামুদ্রার মতো নারীরা স্তোত্র রচনা করেছিলেন এবং শিক্ষায় অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

 * **সামাজিক অংশগ্রহণ:** নারীরা 'সভা' ও 'সমিতি' নামক রাজনৈতিক সংস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারতেন।

 * **বিবাহ ও কুপ্রথার অনুপস্থিতি:** বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা বা পর্দা প্রথার প্রচলন ছিল না। প্রাপ্তবয়সে বিবাহের নিয়ম ছিল এবং পুনর্বিবাহ (নিযোগ প্রথা) প্রচলিত ছিল।

### ৪. খাদ্য, পানীয় ও বিনোদন

 * আর্যদের প্রধান খাদ্য ছিল যব (যবগা), দুধ, মাখন, ঘি ও মাংস।

 * ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে **'সোমরস'** এবং আনন্দ উৎসবে **'সুরা'** নামের পানীয় ব্যবহৃত হতো।

 * পাশা খেলা, রথদৌড়, গান এবং নৃত্য ছিল প্রধান বিনোদন।

## দ্বিতীয় অংশ: পরবর্তী বৈদিক যুগে সামাজিক পরিবর্তন

১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর থেকে পূর্ব ভারতে (গাঙ্গেয় উপত্যকায়) আর্যদের বিস্তারের সাথে সাথে সমাজ জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়।


| সামাজিক উপাদান | আদি বৈদিক যুগ (১৫০০-১০০০ খ্রিঃপূঃ) | পরবর্তী বৈদিক যুগ (১০০০-৬০০ খ্রিঃপূঃ) |

| :--- | :--- | :--- |

| **বর্ণ ব্যবস্থা** | কর্মভিত্তিক ও নমনীয় | জন্মভিত্তিক ও অনমনীয় |

| **নারীর স্থান** | স্বাধীন ও সম্মানজনক | মর্যাদা হ্রাস ও সিদ্ধান্তহীনতা |

| **রাজনৈতিক ভূমিকা** | 'সভা' ও 'সমিতিতে' সর্বসাধারণের প্রবেশ | রাজতন্ত্রের সুদৃঢ়তা ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা হ্রাস |

| **জীবনভিত্তিক আশ্রম** | সুনির্দিষ্ট আশ্রমপ্রথা অনুপস্থিত | 'চতুরাশ্রম' প্রথার বিস্তার |


### ১. জাতিভেদ প্রথার দৃঢ়তা ও জন্মভিত্তিক বর্ণ

 * **কঠোর চতুর্বর্ণ:** পরবর্তী বৈদিক যুগে বর্ণপ্রথা কর্মভিত্তিক না থেকে **জন্মভিত্তিক** ও কঠোর আকার ধারণ করে। সমাজ স্পষ্টত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র— এই চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

 * **ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের আধিপত্য:** সমাজে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের স্থান সর্ব শীর্ষে পৌঁছে এবং বৈশ্যদের ওপর করভার অর্পিত হয়। শূদ্রদের অধিকার সম্পূর্ণ কেড়ে নিয়ে তাদের উচ্চ তিন বর্ণের সেবায় নিযুক্ত করা হয়। অসপৃষ্টতার (অস্পৃশ্যতা) প্রারম্ভিক ইঙ্গিত এই যুগেই পাওয়া যায়।

### ২. নারীদের মর্যাদার অবনমন

 * **অধিকার সংকোচন:** পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীদের সামাজিক মর্যাদা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। তাদের 'সভা' ও 'সমিতিতে' যোগদানের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

 * **কন্যাপুত্র বৈষম্য:** কন্যাসন্তানের জন্মকে সমাজের জন্য দুঃখের কারণ হিসেবে গণ্য করা শুরু হয় (*ঐতরেয় ব্রাহ্মণ* গ্রন্থে বলা হয়েছে— *"কন্যা হলো দুঃখের উৎস, কিন্তু পুত্র হলো পরিবারের রক্ষক"*)।

 * **কুপ্রথার সূচনা:** বাল্যবিবাহ প্রথার সূচনা ঘটে, শিক্ষা গ্রহণের অধিকার সংকুচিত হয় এবং বহুবিবাহের বিস্তার ঘটে। তবে গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষী নারী এই যুগের ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

### ৩. চতুরাশ্রম প্রথার বিকাশ

পরবর্তী বৈদিক যুগে মানুষের জীবনকে চারটি পর্যায়ে বা আশ্রমে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যাকে **'চতুরাশ্রম'** বলা হয়:

 1. **ব্রহ্মচর্য:** গুরুর আশ্রমে থেকে বিদ্যাচর্চা।

 2. **গার্হস্থ্য:** বিবাহ ও সংসারধর্ম পালন।

 3. **বানপ্রস্থ:** সংসার ত্যাগ করে বনে গিয়ে ধ্যানচর্চা।

 4. **সংন্যাস:** সর্বসংগম ত্যাগ করে মোক্ষলাভের চেষ্টা।

   *(ছাান্দোগ্য উপনিষদে প্রথম তিনটি এবং জাবাল উপনিষদে চারটি আশ্রমেরই উল্লেখ পাওয়া যায়।)*

### ৪. গোত্র প্রথার উদ্ভব

পরবর্তী বৈদিক যুগে **'গোত্র'** প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি ঘটে। একই বংশোদ্ভূতদের সমগোত্রীয় বলে মনে করা হতো এবং সমগোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ (Exogamy) ঘোষিত হয়।

## উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আদি বৈদিক যুগের সাম্যবাদী, উন্মুক্ত ও উপজাতীয় সমাজ পরবর্তী বৈদিক যুগে এসে শ্রেণিবিভক্ত, পিতৃতান্ত্রিক ও কঠোর নিয়মকানুনে আবদ্ধ সমাজে পরিণত হয়। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও রাজতন্ত্রের উত্থানই সামাজিক সম্পর্কের এই আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। এই সময় গড়ে ওঠা চারবর্ণের কাঠামোই পরবর্তী হাজার বছর ধরে ভারতীয় সমাজ কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...